অন্য এক বাইশে শ্রাবণ…
কবিতা চন্দ
(অনুলিখনে সৌম্যা ঘোষ)

রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ-দিবস বাইশে শ্রাবণের উৎসবাদি, শান্তিনিকেতন কি অন্যত্র বৃক্ষরোপণ এবং কবির স্মৃতিপূজার আয়োজন যে যেভাবে পারেন, তার মতো করেই করেন। সে সব কথা সাজাতে গেলে প্রায় একই ধরণের কথা সেজে উঠবে।
এবার রবীন্দ্রনাথের নিজের জীবনের এক মর্মান্তিক বাইশে শ্রাবণের কথা কিছু বলি।
১৯৩২-এর এক বাইশে শ্রাবণের দিন। অবশ্য এসব কথাও এখন আর এত বছর রবীন্দ্রস্মৃতি তর্পণের দৌলতে খুব একটা নতুন নয়। তবু কেন জানি বাইশে শ্রাবণ আর রবীন্দ্রনাথ এই দু’টির যোগে আমার কেবলই এমন দিনে রবীন্দ্রনাথের ব্যথাভরা মনটির কথা মনে পড়ে।
ওই বছর রবীন্দ্রনাথের একমাত্র নাতি নীতীন্দ্রনাথ জার্মানিতে পড়তে গিয়ে একই সঙ্গে মারাত্মক ব্রঙ্কাইটিস আর যক্ষ্মা বাঁধিয়ে বসেছিল। তার যে এত বড়ো অসুখ হয়েছে সে নিজে কিন্তু জানতো না। মানে তাকে বলা হয়নি আর কি। বয়স তখন তার মাত্র ২১। শরীর দুর্বল আর খুব জ্বর আসছিল মাঝে মধ্যেই তার। ডাক্তারী পরীক্ষায় জানা গেল যে তার দু’টি লাংস্-ই ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নীতীন্দ্রনাথ মানে বাড়ির আদরের নীতু ছিল রবীন্দ্রনাথের কন্যা মীরার একমাত্র পুত্র। মীরার একটি মেয়েও ছিল নন্দিতা (বুড়ি)।
রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র শমীর পর এই নীতুই ছিল রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড়ো স্নেহাসক্তির ধন। মীরার বিবাহিত জীবন ছিল খুবই দুঃসহ নানা কারণে। যা একসময় নীতুর চূড়ান্ত মানসিক কষ্টের কারণ ছিল।
আজ মনে হয়, নীতুর বুকের এই ক্ষয়রোগ কি এখান থেকেই তার জন্য বাঁধিয়ে বসেছিল আগেই! তাই কি ওই দেশের ঠান্ডা লাগাটা সে সামলাতে পারল না?

যা হোক, নীতু এই একটু ভাল, এই একটু খারাপ— সব খবর ক’দিন ধরেই রবীন্দ্রনাথের কাছে আসছিল। ‘পুনশ্চ’র কবিতাগুলির সাল তারিখ দেখে পড়লে বোঝা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ হয়তো বুঝেছিলেন এই দীপ নিভবে। কিন্তু তা তাঁর নিজের পক্ষে আর মীরার পক্ষে সহ্যাতীত হবে! খেয়াল করলে দেখা যায়, এই ‘পুনশ্চ’ কবিতার বই নীতু-কেই উৎসর্গ করেছেন রবীন্দ্রনাথ।
অসুস্থ নীতুকে রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখছেন কিন্তু নিজের ভেতরের আশঙ্কার কথা তাতে বিন্দুমাত্র থাকছে না। শুধু একটি চিঠিতে জানাচ্ছেন যে নীতুর কাছে তাঁর যেতে ইচ্ছে করছে।
এক আসন্ন বাইশে শ্রাবণের জন্য রবীন্দ্রনাথের এই যে প্রস্তুতি কাল, এইটা আমাকে খুব নাড়িয়ে দেয়। মৃত্যু-আঘাত তো কম পাননি তিনি জীবনে। এক শমী ছাড়া এ বাড়ি থেকে কাছের যে ক’জন চলে গেছেন, প্রত্যেককে তিনি সেবা করেছেন শেষ দিন পর্যন্ত।
তারপর মেনে নিয়েছেন তাঁদের এই দুয়ারটুকু পার হয়ে যাওয়ার অমোঘ সত্যটিকে বেদনভরেই।
কিন্তু নীতুকে যখন ছাড়বার সময় এগিয়ে আসছে আর দূর থেকেই তিনি তা অনুমান করতে পারছেন, তখন তাঁর অনেক বয়স হয়ে গিয়েছে। শেষ আদরের ধনকে যেন এসময় ছেড়ে দেওয়া আর ওই স্বাভাবিক সত্য বলে ভেতর থেকে মানতে পারছেন না। এই সময়কার কবিতার ভাষা দেবে তার সাক্ষ্য।
যে অরুন্তুদ যাতনা রবীন্দ্রনাথকে এই সময় দগ্ধ করেছে তা প্রকাশের যে ভাষা আমরা এই সময় দেখছি তা আগে কখনও পাইনি।


লিখছেন: “ওরে শোকাতুর, শেষে/শোকের বুদ্বুদ তোর অশোকসমুদ্রে যাবে ভেসে।” বাইশে শ্রাবণ নীতুর চলে যাওয়ার খবর পরে এসে যখন দেশে পৌঁছলো, সেই দিন লিখলেন:
“দুঃখের দিনে লেখনীকে বলি/লজ্জা দিও না। / সকলের নয় সে আঘাত/ধরো না সবার চোখে।”
সেই চিরকালের মতো একলাই নিজের দুঃখ বহন করতে চাইছেন। কিন্তু বড়ো যাতনাও লুকোতে আর পারছেন না এই বয়সে।
এরপর থেকে নিজের নামের আগে ‘শ্রী’ লেখা তিনি বর্জন করেছিলেন। জীবন যেন রবীন্দ্রনাথকে রিক্ত হতে বলছে খুব করে। বুঝতে পারছেন, তাঁর সহ্যশক্তিও প্রায় শেষ হয়ে আসছে।
সে ছিল এক বাইশে শ্রাবণে পাওয়া মর্মান্তিক বেদনা। যা একেবারে শেষ পর্বের এক রবীন্দ্রনাথকে আমাদের চিনিয়ে দেয়।
তাই রবীন্দ্রনাথ আর বাইশে শ্রাবণ শুনলে আমার তাঁর জীবনের এই বাইশে শ্রাবণ-এর কথাই খুব মনে পড়ে।
যে বাইশে শ্রাবণ-এ তিনি নিজে চলে গেলেন সেদিন তো ছিল তাঁর মুক্ত বিহঙ্গ হওয়ার দিন। তা নিয়ে অবশ্য এখন আমরাও আর শোক করি না। গান গাই। বৃক্ষরোপণ করে প্রাণের জয়ধ্বনি দিই।
লেখক পেশায় অধ্যাপক