‘কথোপকথন’ থেকে ‘প্রিয় বন্ধু’ হয়ে জেন-জি’দের প্রেম: বদলেছে সম্পর্কের ভাষা কিন্তু আদত প্রেম? তার কি হবে?
সৌম্যা ঘোষ
‘কথোপকথন’, ‘প্রিয় বন্ধু’, কিংবা হালের ‘ওয়েক আপ সিড’-‘লিটল থিংক্স’-ইনফ্লুয়েন্সাররা— সত্তর দশক থেকে আজকের প্রজন্মে এইসব সিনেমা শ্রুতি নাটক সিরিজের হাত ধরে বদলেছে সম্পর্কের ভাষা।
সত্তরে নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ‘কালবেলা’ উপন্যাসে অনিমেষ মাধবীলতার মতোই পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘কথোপকথনে’ও এক পাগলপারা প্রেমিক যুগলকে পাওয়া যায়। কলকাতা শহর জুড়ে তারা অনবরত কথা বলতে থাকে। মূলত সম্পর্কের অনিশ্চয়তা, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তা, নিজেদের এলোমেলো জীবন ও জীবিকা নিয়েই কথা বলে তারা। কিন্তু, কখনওই নিজেদের ছেড়ে যাওয়ার কথা বলে না।
চল্লিশের দশকে দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’ তেও এমনই এক প্রেমিক-প্রেমিকার কথা জানা যায়। চল্লিশের দশক জুড়ে বাংলার মন্বন্তর ও দেশভাগের ইতিবৃত্ত। তবু, তার মাঝেই একটা গোটা রাত এই দুই প্রাপ্তবয়স্ক খুঁজে চলে আস্তানা। তবু, সামান্য একটুকরো ছাদ আর একটু আড়ালের জন্য তাঁদের সহ্য করতে হয় অজস্র অপমান।
নয়ের দশকে সুমনের লেখা গানেও পাই এমনই এক প্রান্তিক নরনারীকে। ‘ছুটবে কোথায় প্রেম তালকানা, গোপনীয়তার নেই মালিকানা/এই প্রেমিকের ও আসল ঠিকানা/দশ ফুট বাই দশ ফুট।’
অর্থাৎ, দশক বদলালেও বদলেছে সম্পর্কের ভাষা কিন্তু বদলায়নি আদত সম্পর্কের চাহিদাগুলো।


অঞ্জন দত্তের ‘প্রিয় বন্ধু’ও বলে আধুনিক সম্পর্কের আর এক আখ্যান। ছোটবেলার দুই বন্ধু অর্ণব আর জয়িতা ‘কথোপকথনে’র ওই দুই নারী-পুরুষের মতোই অনর্গল কথা বলে চলে। কিন্তু, সময়ের ফারাক এসে ছায়া ফেলে এই কথাবার্তায়। সত্তরের দশক আর নব্বই বা পরবর্তী দশকে প্রেমের সংলাপও বদলে যায়। এখানেও তারা অনিশ্চিত তাদের ভবিষ্যৎ বা সম্পর্ক নিয়ে। এমনকি, খুব কাছে চলে আসার পরে অর্ণব বোঝে যে দূরে থাকা দরকার, কারণ না হলে তাদের বন্ধুতা নষ্ট হবে। অর্ণবের মানিকতলার নোনাধরা বাড়ির দেওয়াল স্যাঁতসেঁতে কলতলা, মায়ের ছেঁড়া আঁচলের হলুদের গন্ধ— অর্ণবের এই ভীষণ মধ্যবিত্ত বড় হওয়ার সঙ্গে বিস্তর ফারাক স্বাধীন ভাবে বড় হওয়া জয়িতার। কাজেই অর্ণব সড়ে আসে।
অর্থাৎ, কথা বলতে বলতেই বারবার দেখি, কাছে আসছে ও দূরে চলে যাচ্ছে বাঙালির প্রেম। শুধু সময় বদলে যাচ্ছে। আর, সেই বদল ধরা থাকছে এইসব গানে-লেখায়-সিনেমায়।

একবিংশ শতকের সম্পর্কের ভাষা যদিও একেবারেই আলাদা। ওয়েব সিরিজ থেকে আজকের ইনফ্লুয়েন্সরদের বলা সম্পর্ক একেবারেই আনকোরা। ২০০৫-এ ফেসবুক, ২০১০-এ হোয়াটসঅ্যাপ এবং তার পরবর্তী ইনস্টাগ্রাম ও অন্যান্য সমাজ মাধ্যমের মধ্য দিয়ে ঘটেছে এই বদল। তার সঙ্গে ডিপ্রেশন, কর্পোরেট জীবনের চাপে কমেছে মানুষের একসাথে থাকার ইচ্ছে। এই সময়ের গান তাই লিখেছে— ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও/আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি’।
অপশন যত বেড়েছে কমতে থেকেছে সম্পর্কের বিশ্বাস। আর তারই ছায়া আমরা দেখি, ‘ওয়েক আপ সিড’ থেকে হালের লিটল থিংক্স সিরিজে। মূলত, লিভ-ইন সম্পর্ক, পরস্পরের স্পেসকে বোঝা কিংবা দরকারে নির্মমভাবে নিজের টুকু বুঝে সরে আসা। এই সবই ঘুরে ফিরে আসছে। আপাতভাবে আধুনিক চকচকে সম্পর্কের গল্প হলেও কোথাও যেন ভেতরে ভেতরে ফাঁপা ও একা সকলেই। বিশ্বাস শব্দটাই যেন ভ্যানিশ এই সময় থেকে। বদলে একরাশ ইগো আর প্রতিহিংসা। সত্তর আশি বা নব্বই বছরের সম্পর্কের গল্পে হাজার প্রতিকুলতার মধ্যেও যে হাতে হাত ধরে একসাথে বাঁচার সাহস ছিল, তা এই উত্তরাধুনিক সময়ে শপিং মল-কফি শপের প্রেমের গল্পে জাস্ট নেই হয়ে গিয়েছে। তবুও, ইনফ্লুয়েন্সাররা রোজই বলছে আজকের সম্পর্কের গল্প, কিন্তু তা থেকে লক্ষ যোজন দূরে ‘কথোপকথনে’র সেই যুবতী বা প্রিয় বন্ধুর অর্ণব-জয়িতা। এ যেন এক অন্য পৃথিবীর গল্প। যেখানে সব আছে, শুধু নেই ভালোবাসা। মহীনের ঘোড়ারা অনেক দিন আগেই যেমনটা গানে বলেছিল—
‘পাশাপাশি বসে একসাথে দেখা/একসাথে নয় আসলে যে একা/তোমার আমার ফারাকের নয়া ফন্দি’।