ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে এখনও পরাধীন কারা?
অরূপরতন চক্রবর্তী

৮০ বছর আগে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার সেই আলো কি পৌঁছেছে প্রত্যেক ভারতীয়ের ঘরে?
১৫ অগাস্ট [ 15th August ] আবার আসছে। বাড়ির ছাদে পতাকা উঠবে, স্কুলে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হবে, টেলিভিশনে স্বাধীনতার ইতিহাস ফিরে আসবে। আমরা মনে করব ১৯৪৭-এর সেই রাতের কথা—সেই ‘ট্রাইস্ট উইথ ডেস্টিনি’ ভাষণ যে রাতে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হয়েছিল। কিন্তু এই উদ্যাপনের মধ্যেই একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন কি আমরা করতে পারি? দেশ স্বাধীন হয়েছে ৮০ বছর আগে। কিন্তু দেশের প্রতিটি মানুষ কি সত্যিই স্বাধীন?
স্বাধীনতা মানে শুধু বিদেশি শাসকের হাত থেকে মুক্তি নয়। স্বাধীনতা মানে নিজের পরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারা, সম্মান নিয়ে কাজ করা, নিজের জমি-জঙ্গল থেকে উচ্ছেদ না হওয়া, সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করার সুযোগ পাওয়া এবং বিপদের সময়ে রাষ্ট্রের পাশে থাকা। এই জায়গাতেই ভারতের স্বাধীনতার গল্পে কিছু অসমাপ্ত অধ্যায় রয়ে গিয়েছে।
যে মানুষটি আজও নর্দমায় নামেন
দেশে ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং নিষিদ্ধ। আইন আছে, সরকারি প্রকল্প আছে, পুনর্বাসনের কথাও আছে। তবু নর্দমা বা সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে শ্রমিকের মৃত্যুর খবর মাঝেমধ্যেই সংবাদপত্রের পাতায় আসে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নর্দমা ও সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে ৩৩২ জন স্যানিটেশন কর্মীর মৃত্যুর কথা সরকার সংসদে জানিয়েছে। প্রশ্নটা শুধু একটি শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে নয়। প্রশ্ন হল—একজন মানুষকে এমন কাজ করতে হবে কেন, যেখানে কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরাটাই নিশ্চিত নয়? আরও কঠিন প্রশ্ন, এই কাজের সঙ্গে জাতপাতের দীর্ঘ সম্পর্ক কি আমরা সত্যিই মুছে ফেলতে পেরেছি? স্বাধীনতার ৮০ বছর পরেও যদি কারও জন্ম তার পেশা এবং সামাজিক অবস্থান অনেকটাই নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে আমাদের স্বাধীনতার অর্থ নিয়ে নতুন করে ভাবতেই হবে।

জঙ্গলের অধিকার, জমি আর উন্নয়নের গল্প
ভারতের উন্নয়ন দরকার। রাস্তা দরকার, শিল্প দরকার, বিদ্যুৎ দরকার, খনি ও পরিকাঠামোও দরকার। কিন্তু উন্নয়নের মানচিত্র যখন তৈরি হয়, তখন সেই মানচিত্রে কারা থাকে? আদিবাসী মানুষের কাছে জঙ্গল শুধুমাত্র কাঠ বা খনিজের উৎস নয়। জমি শুধু সম্পত্তি নয়। নদী, পাহাড়, বন—সব মিলিয়েই তাঁদের জীবন, সংস্কৃতি এবং অস্তিত্ব। তাই কোনও বড় প্রকল্পের জন্য যখন তাঁদের জমি অধিগ্রহণ হয়, তখন ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়ে কি সত্যিই সেই ক্ষতি পূরণ করা যায়? একটি পরিবার হয়তো নতুন বাড়ি পায়। কিন্তু হারিয়ে যায় তার পুরনো গ্রাম, চেনা জঙ্গল, জীবিকার পথ, কখনও বা কয়েক প্রজন্মের সামাজিক সম্পর্ক। উন্নয়ন যদি কাউকে পিছনে ফেলে এগোয়, তাকে কি সম্পূর্ণ উন্নয়ন বলা যায়?
স্বাধীনতার পরেও ‘অপরাধী’ তকমার ছায়া
Denotified ও Nomadic Tribes-এর ইতিহাস আরও জটিল। ব্রিটিশ শাসনে বহু যাযাবর ও প্রান্তিক সম্প্রদায়কে ‘Criminal Tribes’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পরে সেই আইন বাতিল হয়েছে। কিন্তু একটি সরকারি তকমা মুছে গেলেই কি সমাজের চোখের তকমা মুছে যায় অনেক পরিবার এখনও স্থায়ী ঠিকানা, জমির অধিকার, পরিচয়পত্র, শিক্ষা ও সরকারি সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়। একটি শিশুর জন্মের সঙ্গে তার কোনও অপরাধের সম্পর্ক নেই। তবু যদি তার সম্প্রদায়ের পুরনো পরিচয় তাকে সন্দেহের চোখে দেখার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই— আমরা কি সত্যিই ঔপনিবেশিক মানসিকতার সেই ছায়া থেকে বেরিয়ে এসেছি?

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা [ financial independence ] কোথায়?
ভারতের অর্থনীতি এগিয়েছে। নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে, শহর বদলেছে, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু দেশের একটা বড় অংশ এখনও অনিশ্চিত কাজের উপর নির্ভরশীল।
ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, পরিযায়ী শ্রমিক কিংবা অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মী—তাঁদের কাছে একটি কাজ হারানো মানে শুধু বেতন হারানো নয়। কখনও তার অর্থ হয় সন্তানের স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া, বাড়িভাড়া বাকি পড়া, চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া কিংবা ঋণের বোঝা আরও বেড়ে যাওয়া। আমরা যখন বলি ভারত বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, তখন এই মানুষগুলির প্রশ্নও কি সেই হিসাবের মধ্যে থাকে?

স্বাধীনতার আসল পরীক্ষা
স্বাধীনতার ৮০ বছরে ভারত অনেক দূর এগিয়েছে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু একটি দেশের সাফল্য শুধু তার GDP, মহাকাশ অভিযান, মেট্রো রেল বা উঁচু সেতু দিয়ে মাপা যায় না। সাফল্য মাপতে হয় সেই মানুষটির জীবন দিয়েও, যে এখনও জাতের কারণে অপমানিত হয়। সেই আদিবাসী পরিবারের জীবন দিয়েও, যে উন্নয়নের জন্য নিজের জমি হারায়। সেই পরিযায়ী শ্রমিকের জীবন দিয়েও, যার কোনও স্থায়ী নিরাপত্তা নেই। সেই নর্দমা সাফাই কর্মীর জীবন দিয়েও, যে প্রতিদিন অন্যের শহর পরিষ্কার করে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
তাই ১৫ অগাস্টের দিন হয়তো আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করা দরকার। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৮০ বছর পরেও যদি কিছু মানুষ সম্মান, নিরাপত্তা, জমি, জীবিকা এবং সমান সুযোগের জন্য লড়াই করেন, তা হলে তাঁদের জন্য স্বাধীনতা কতটা সম্পূর্ণ?
ভারত পরাধীন নয়। ভারত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। স্বাধীনতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা এখনও বাকি—রাষ্ট্রের স্বাধীনতাকে মানুষের স্বাধীনতায় পরিণত করা। ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে [ 80th Independence Day ] তাই শুধু পতাকা নয়, উঠুক সেই প্রশ্নও—এই স্বাধীনতার আলো কি সত্যিই সবার ঘরে পৌঁছেছে?