এক ক্লিকেই বাজার, ফাঁকা হচ্ছে পাড়ার দোকান! কুইক কমার্স-ই কমার্সের দাপটে বদলে যাচ্ছে কলকাতার কেনাকাটার মানচিত্র
অরূপরতন চক্রবর্তী
Blinkit-Zepto-Instamart পৌঁছে দিচ্ছে মুদিখানা থেকে মাছ-মাংস মিনিটে, Amazon-Flipkart-Myntra-Nykaa-র সেল টানছে পোশাক-প্রসাধনীর ক্রেতা। চাপ বাড়ছে পাড়ার মুদির দোকান থেকে গড়িয়াহাট-হাতিবাগানের চেনা ব্যবসায়ীদের উপর। সুবিধার ডিজিটাল বাজারের সামনে কতটা টিকতে পারবে কলকাতার পুরনো খুচরো ব্যবসা?
একটা সাবান ফুরিয়েছে? চাল-ডাল দরকার? রান্নার মাঝখানে দেখা গেল পেঁয়াজ নেই? আগে ভরসা ছিল পাড়ার মুদির দোকান। ফোন করে বললে পরিচিত দোকানদার বাড়িতেও পাঠিয়ে দিতেন। এখন সেই জায়গায় ক্রমশ ঢুকে পড়েছে স্মার্টফোনের কয়েকটি অ্যাপ। Blinkit, Zepto কিংবা Swiggy Instamart খুলে কয়েকটি ক্লিক—দরজায় হাজির সদাইপাতি।

শুধু মুদিখানাই নয়। পুজোর জামা, জুতো, প্রসাধনী কিংবা ব্যাগ কিনতে একসময় কলকাতার মধ্যবিত্তের বড় ভরসা ছিল গড়িয়াহাট, হাতিবাগান, নিউ মার্কেটের মতো বাজার। এখন সেই বাজারেও ভাগ বসিয়েছে Amazon, Flipkart, Myntra, Nykaa-র মতো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে উৎসবের মরসুমে ‘মেগা সেল’, ‘ফ্ল্যাট ডিসকাউন্ট’, ব্যাঙ্ক অফার আর বিনামূল্যে ডেলিভারির হাতছানি ক্রেতার একটা বড় অংশকে দোকানের বদলে মোবাইলের পর্দায় আটকে রাখছে।
মুদির দোকানের নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী ‘১০ মিনিট’
ভারতের শহুরে বাজারে কুইক কমার্সের উত্থান গত কয়েক বছরে খুচরো ব্যবসার সমীকরণটাই বদলে দিয়েছে। Blinkit, Zepto, Swiggy Instamart-এর মতো সংস্থা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ‘ডার্ক স্টোর’ তৈরি করে দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। ফলে বড় দোকান বা সুপারমার্কেটে যাওয়ার প্রয়োজন তো কমছেই, একই সঙ্গে দৈনন্দিন ছোটখাটো কেনাকাটার ক্ষেত্রেও পাড়ার দোকানের উপর নির্ভরতা কমছে।
এর সঙ্গে রয়েছে অফার। কখনও নির্দিষ্ট পণ্যে ছাড়, কখনও কুপন, কখনও ব্যাঙ্ক বা ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা। এক ছাদের নীচে—বরং এক স্ক্রিনে—চাল, ডাল, তেল থেকে আইসক্রিম, ফল, সবজি, প্রসাধনী, স্টেশনারি—সবই মিলছে। সময় বাঁচানোর এই সুবিধা বিশেষ করে কর্মব্যস্ত শহুরে পরিবার ও তরুণ প্রজন্মকে দ্রুত কুইক কমার্সের দিকে টানছে।
অন্য দিকে পাড়ার ছোট দোকানদারের পক্ষে প্রতিটি পণ্যে ছাড় দেওয়া বা বিশাল মজুত রাখা সম্ভব নয়। ফলে দীর্ঘ দিনের পরিচিত ক্রেতার একটা অংশও ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে অনলাইন বাজারে।
গড়িয়াহাট-হাতিবাগানের লড়াই আরও কঠিন
একই ছবি পোশাকের বাজারেও। গড়িয়াহাটের ফুটপাত থেকে বড় দোকান কিংবা হাতিবাগানের পুরনো পোশাকের বিপণি—কলকাতার কেনাকাটার সংস্কৃতির সঙ্গে এই বাজারগুলির সম্পর্ক বহু দিনের। বিশেষ করে দুর্গাপুজোর আগে এই দুই এলাকার ভিড় একসময় ছিল শহরের পরিচিত ছবি।
সেই ভিড় এখনও আছে। কিন্তু তার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে আর একটি ‘ভার্চুয়াল গড়িয়াহাট’—যেখানে রাত দুটোতেও কেনাকাটা করা যায়।

Amazon ও Flipkart-এর উৎসবকালীন সেল, Myntra-র ফ্যাশন-কেন্দ্রিক ছাড় কিংবা Nykaa-র প্রসাধনী ও লাইফস্টাইল পণ্যের অফার ক্রেতাকে দিচ্ছে বিপুল বিকল্প। একই পোশাকের বিভিন্ন ব্র্যান্ড, রং, মাপ ও দাম কয়েক মিনিটে তুলনা করা যাচ্ছে। পছন্দ না হলে অনেক ক্ষেত্রেই ফেরত দেওয়ার সুযোগও রয়েছে। দোকান থেকে দোকানে ঘুরে দাম যাচাইয়ের বদলে এখন মোবাইলেই চলছে ‘প্রাইস কম্প্যারিজন’।
বদলে যাচ্ছে নতুন প্রজন্মের অভ্যাস
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে সময় ও সুবিধা। যানজট ঠেলে বাজারে যাওয়া, পার্কিং খোঁজা, ভিড়ের মধ্যে দোকানে দোকানে ঘোরা—এই ঝক্কি এড়িয়ে বাড়িতে বসেই কেনাকাটাকে স্বাভাবিক অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করছে নতুন প্রজন্ম।
তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অ্যালগরিদমের বিপণন-কৌশল। একবার কোনও পোশাক বা প্রসাধনী খুঁজলেই পরের কয়েক দিন ফোনের পর্দায় হাজির হতে থাকে একই ধরনের পণ্যের বিজ্ঞাপন। ‘মাত্র কয়েক ঘণ্টার অফার’, ‘স্টক শেষ হওয়ার আগে কিনুন’—এই ডিজিটাল তাগিদও ক্রেতাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করছে।
তবে কি শেষ হয়ে যাবে পাড়ার বাজার?
ছবিটা অবশ্য একেবারে একপেশে নয়। পাড়ার দোকানের এখনও এমন কিছু শক্তি রয়েছে, যা অ্যাপ সহজে দিতে পারে না। পরিচিত দোকানদারের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বাকিতে জিনিস নেওয়ার সুযোগ, কোনও পণ্য হাতে ধরে দেখে কেনা কিংবা সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে বদলে নেওয়া—এই সুবিধাগুলি এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
গড়িয়াহাট বা হাতিবাগানের ক্ষেত্রেও একই কথা। দরদাম, কাপড় ছুঁয়ে দেখা, ট্রায়াল, দোকানদারের পরামর্শ এবং সবচেয়ে বড় কথা—‘বাজার করার অভিজ্ঞতা’ অনলাইন এখনও পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারেনি। পুজোর আগে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে বাজারে বেরোনোর যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাস, সেটিও কলকাতার খুচরো বাজারের বড় শক্তি।
তবু দেওয়ালের লিখন স্পষ্ট। লড়াইটা আর শুধু পাশের দোকানের সঙ্গে পাশের দোকানের নয়। পাড়ার মুদির দোকানদারের প্রতিদ্বন্দ্বী এখন কোটি কোটি টাকার প্রযুক্তিনির্ভর কুইক কমার্স সংস্থা। গড়িয়াহাটের পোশাক ব্যবসায়ীর প্রতিযোগী শুধু সামনের বিপণি নয়, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের যে কোনও প্রান্তে বসে পণ্য বিক্রি করা অনলাইন বিক্রেতাও।
কলকাতার বাজার তাই হয়তো হারিয়ে যাবে না, কিন্তু তাকে বদলাতে হবেই। হোয়াটসঅ্যাপে অর্ডার, নিজস্ব হোম ডেলিভারি, ডিজিটাল পেমেন্ট, সোশ্যাল মিডিয়ায় পণ্যের প্রচার—পুরনো দোকানগুলিকেও ক্রমশ নতুন প্রযুক্তিকে সঙ্গী করতে হবে।
কারণ ক্রেতা এখন আর শুধু ‘কোথায় সস্তা’ দেখছেন না। তাঁর প্রশ্ন—কোথায় সস্তা, কোথায় বেশি বিকল্প, আর কত তাড়াতাড়ি জিনিসটা আমার দরজায় পৌঁছবে?
সেই তিন প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দিচ্ছে কলকাতার আগামী দিনের বাজারের মানচিত্র।