বৃষ্টি পড়লেই হাঁড়িতে খিচুড়ি, কড়াইয়ে ইলিশ! বর্ষায় বাঙালির পেটেও নামে ‘খাওয়ার মরসুম’
অরূপরতন চক্রবর্তী

বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি, ভিতরে সর্ষের তেলে মাছ ভাজার ছ্যাঁকছোঁক! খিচুড়ি-ইলিশ থেকে কুমড়ো-শাক, পটল-ঝিঙে কিংবা মৌরলা-পুঁটি—বর্ষার রবিবারে বাঙালির রান্নাঘরই যেন আসল ‘উইকএন্ড ডেস্টিনেশন’। ডায়েট? সে সোমবার থেকে দেখা যাবে!
সকাল থেকে আকাশ কালো। বারান্দার গ্রিলে জলের ফোঁটা, রাস্তায় ছাতার মিছিল। রবিবার হলে তো কথাই নেই। এমন দিনে বাঙালিকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘লাঞ্চে কী হবে?’—উত্তর দেওয়ার আগে সে আকাশের দিকে তাকাবে। তারপর প্রায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে উচ্চারিত হবে সেই অমোঘ শব্দ—খিচুড়ি!
আর খিচুড়ি যদি হয়, পাশে ইলিশ মাছ ভাজা না থাকলে ব্যাপারটা অনেকটা বিরিয়ানি থেকে আলু সরিয়ে নেওয়ার মতো। আইনত অপরাধ নয়, কিন্তু আবেগে গুরুতর আঘাত।
খিচুড়ির পাশে ইলিশ—বর্ষার রাজা-রানি
মুগডাল শুকনো কড়াইয়ে ভেজে চালের সঙ্গে মিশিয়ে আলু, ফুলকপি যদি মরসুমে মেলে, মটরশুঁটি কিংবা অন্য সবজি দিয়ে ঘন খিচুড়ি—উপরে এক চামচ ঘি। সঙ্গে বেগুনভাজা, পাপড় আর ইলিশ ভাজা। ইলিশের গরম তেলটুকু খিচুড়ির উপর ছড়িয়ে দিলে তখন আর ডাইনিং টেবিলে বেশি কথা চলে না।
আর মাছের পেটে ডিম থাকলে? ব্যস! বর্ষার রবিবার আচমকাই উৎসবে পরিণত।
ইলিশের ডিম নুন-হলুদ মাখিয়ে মুচমুচে করে ভাজা যায়। কেউ আবার পেঁয়াজ-কাঁচালঙ্কা দিয়ে ডিমের বড়া বানান। ইলিশের মাথা দিয়ে কচুশাক কিংবা পুঁইশাকও বহু বাঙালি বাড়ির পুরনো বর্ষার পদ।
ইলিশেই বর্ষা শেষ নয়
ইলিশ নিঃসন্দেহে বর্ষার ‘সেলিব্রিটি’। কিন্তু বাংলা রান্নাঘরের চরিত্রাভিনেতারাও কম যান না।

বর্ষায় বাজারে পাওয়া যায় নানা ছোট মাছ। মৌরলা, পুঁটি, ট্যাংরা, কই, শিঙি, মাগুর—ঠিক মতো রান্না হলে ইলিশের জনপ্রিয়তার মধ্যেও নিজেদের জায়গা করে নেয়। ট্যাংরা মাছের ঝাল, কই মাছের ঝোল, মৌরলা-পুঁটির চচ্চড়ি কিংবা শিঙি-মাগুরের হালকা ঝোল—বৃষ্টির দিনে গরম ভাতের সঙ্গে দিব্যি জমে।
বর্ষার বাজারে ভালো দেশি মাছ পেলে বাঙালি ক্রেতার চোখ যে ভাবে চকচক করে, শেয়ারবাজার চড়লেও সম্ভবত ততটা করে না।
নিরামিষের পাতেও বর্ষার বাহার
‘বর্ষা মানেই শুধু মাছ’—এ কথা বললে বাড়ির ঠাকুমা-দিদিমারা সম্ভবত প্রবল আপত্তি জানাতেন।
এই সময়ে কচুশাক, পুঁইশাক, লাউ, ঝিঙে, পটল, কুমড়ো, কাঁচকলা, কচু দিয়ে কত রকমের ঘরোয়া রান্না হয় তার হিসেব রাখা কঠিন। কচুশাক নারকেল দিয়ে, পুঁইশাকের চচ্চড়ি, ঝিঙে-পোস্ত, পটলের দোলমা বা সাধারণ পটলের ঝোল, কুমড়োর ছক্কা, কাঁচকলার কোফতা কিংবা লাউয়ের তরকারি—নিরামিষ পাতও দিব্যি জমজমাট।
তার সঙ্গে যদি থাকে উচ্ছে বা করলার ভাজা, আলু-পোস্ত, ডাল আর গরম ভাত—তাহলে মাছ না থাকলেও বাঙালির দুপুর মোটেই ‘অসম্পূর্ণ’ নয়। যদিও বাড়ির কোনও এক সদস্য ঠিকই বলবেন, ‘একটা মাছ হলে মন্দ হত না!’

বিকেলে বৃষ্টি? তেলেভাজা ডাকছে
বর্ষার খাদ্যসংস্কৃতি শুধু দুপুরের পাতে আটকে থাকবে কেন?
বিকেল চারটে। আবার মেঘ করেছে। এই সময় শরীরের ভিতর থেকে রহস্যময় নির্দেশ আসে—চা করো।
চায়ের সঙ্গে বেগুনি, আলুর চপ, পেঁয়াজি, ফুলুরি কিংবা ডালের বড়া হলে বৃষ্টি দেখার আনন্দ দ্বিগুণ। সঙ্গে মুড়ি এবং কাঁচালঙ্কা থাকলে তো বাঙালির ‘মনসুন প্যাকেজ’ সম্পূর্ণ।
স্বাস্থ্যসচেতন কেউ হয়তো বলবেন, ‘এত তেল খাওয়া ঠিক নয়।’ তাঁকে এক কাপ লিকার চা দিয়ে সাময়িক ভাবে অন্য ঘরে বসানো যেতে পারে।
রবিবারের বর্ষা-স্পেশাল মেনু
তা হলে আদর্শ বৃষ্টির রবিবারের মেনু কী? শুরুতে গরম বেগুনি। দুপুরে ভুনা মুগের খিচুড়ি, ইলিশ মাছ ভাজা, ইলিশের ডিম ভাজা, বেগুনভাজা, পাপড়। ইলিশ না মিললে ট্যাংরা মাছের ঝাল কিংবা কই মাছের ঝোল। পাশে কচুশাক বা পুঁইশাকের একটি পদ। শেষপাতে আমের চাটনি থাকলে ক্ষতি কী! আর বিকেলে চা-মুড়ি-পেঁয়াজি।

রাতে?
দুপুরের পর বাঙালি সাধারণত ঘোষণা করেন—‘আজ রাতে আর কিছু খাব না।’
কিন্তু রাত ন’টা নাগাদ ফ্রিজ খুলে অবশিষ্ট খিচুড়ির হাঁড়িটার দিকে তাকিয়ে সেই সিদ্ধান্তের যে কী হয়, তা বর্ষার মেঘের মতোই অনিশ্চিত!
আসলে বর্ষা বাঙালির কাছে শুধু একটি ঋতু নয়। জানলায় বৃষ্টির শব্দ, রান্নাঘরে সর্ষের তেলের গন্ধ, কড়াইয়ে ইলিশ ভাজার আওয়াজ আর পরিবারের সঙ্গে এক টেবিলে বসে খাওয়া—সব মিলিয়ে এক টুকরো ঘরোয়া সুখ।
তাই আবহাওয়া দফতর যতই বলুক ‘ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা’, বাঙালির মনে তার অনুবাদ একটাই— কাল বাজার থেকে ইলিশটা আনতে হবে!