অস্ট্রেলিয়ায় হয়েছে, ভারতেও কি ১৬ বছরের কম বয়সী স্কুলপড়ুয়াদের সমাজমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আনা উচিত?
অরূপরতন চক্রবর্তী

অস্ট্রেলিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সীরা আর সহজে সমাজমাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে না। উদ্দেশ্য একটাই—শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা, সাইবার বুলিং কমানো আর সারাক্ষণ মোবাইলের স্ক্রিনে ডুবে থাকার নেশায় লাগাম টানা।
এই সিদ্ধান্তের পর ভারতে একই প্রশ্ন উঠেছে—আমাদের দেশেও কি এমন আইন হওয়া উচিত? উত্তরটা কিন্তু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এ আটকে নেই। দুই দিকেই জোরালো যুক্তি রয়েছে।
আশপাশে তাকালে অন্যতম দৃশ্য শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন। সে রেস্তোরাঁয় হোক বা সিনেমা হলে। বাচ্চাদের ঘ্যানঘ্যান, অবাধ্যতা বন্ধ করতে তাদের মা-বাবারাই তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে নিজেদের মোবাইল ফোন। বাড়িতে শিশুদের নির্ঝঞ্ঝাটে খাওয়ানোর সময়েও হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মোবাইল ফোন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বাচ্চারা ফোনে ঠিক কি দেখছে, থাকছে না তার নজরদারি।
নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তি কি?
আজকাল অনেক স্কুলপড়ুয়ার দিন শুরু হয় মোবাইল দেখে, আর শেষও হয় মোবাইল দেখেই। মাঝখানে বই-খাতা কখন আসে, সেটাই অনেক সময় বোঝা যায় না! রিল, শর্ট ভিডিও, গেম—একটার পর একটা চলতেই থাকে। ফলে পড়াশোনা, খেলাধুলা, এমনকি পরিবারের সঙ্গে গল্প করার সময়ও কমে যাচ্ছে। বই পড়ে পড়াশোনার বদলে চ্যাটজিপিটির মত এআই তিন জনের মাধ্যমে বেরিয়ে আসছে উত্তর। গবেষণাও বলছে, অতিরিক্ত সমাজমাধ্যম ব্যবহার উদ্বেগ, হতাশা, ঘুমের সমস্যা এমনকি আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে।
দ্বিতীয় সমস্যা আরও গুরুতর—সাইবার বুলিং ও অনলাইন অপরাধ। অল্প বয়সে সবাই বোঝে না কোন তথ্য শেয়ার করা উচিত আর কোনটা নয়। সে সুযোগই নেয় প্রতারকরা। ভুঁয়ো পরিচয়ে বন্ধুত্ব, ব্ল্যাকমেল, অনলাইন হয়রানি—এসব এখন আর সিনেমার গল্প নয়, প্রতিদিনের বাস্তব। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পিডোফিলিয়া-সহ শিশুদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন অপরাধচক্রের সক্রিয়তা। তাই একটা বয়স পর্যন্ত কড়া নিয়ন্ত্রণের যুক্তি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তৃতীয় সমস্যা, অ্যালগরিদমের ফাঁদ। সমাজমাধ্যম এমনভাবে তৈরি, যাতে আপনি আর পাঁচ মিনিট নয়, আরও পঞ্চাশ মিনিট থেকে যান। বড়রাই যখন সেই ফাঁদে আটকে যান, তখন স্কুলপড়ুয়াদের দোষ দিয়ে কী হবে!
তবে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও কম যুক্তি নেই।
কোভিডের লকডাউনের সময় থেকেই অনলাইনে পড়াশোনার বাড়বাড়ন্ত। সেই সময় দেশের প্রায় সব স্কুলেই প্রায় দু’বছরের জন্য অনলাইনে ক্লাস করেছে পড়ুয়ারা। দিয়েছে পরীক্ষাও। এখনকার দিনে সমাজমাধ্যম মানেই শুধু নাচ-গান বা মিম নয়। অনেক ছাত্রছাত্রী ইউটিউব দেখে অঙ্ক শেখে, ইনস্টাগ্রামে বিজ্ঞান বা ইতিহাসের পেজ অনুসরণ করে, নতুন ভাষা শেখে, ছবি আঁকা শেখে, এমনকি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিও নেয়। সবার জন্য এক নিয়ম করলে ভালো দিকগুলিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

আরেকটি বাস্তব সমস্যা হল আইন কার্যকর করা। ভারতের মতো দেশে কোটি কোটি মানুষের বয়স যাচাই করবে কে? জন্মসনদ দেখে কি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট খুলবে? অনেকেই বাবা-মায়ের ফোন ব্যবহার করবে, কেউ ভুল বয়স লিখবে। ফলে আইন থাকলেও তা কতটা কাজে লাগবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
অনেক বিশেষজ্ঞ তাই বলছেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, দরকার ডিজিটাল শিক্ষা। যেমন আমরা ছোটবেলায় রাস্তা পার হতে শিখেছি, তেমনই এখন শেখাতে হবে নিরাপদে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে। ভুঁয়ো খবর চিনতে হবে, ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষা করতে হবে, অনলাইনে কেউ বিরক্ত করলে কী করতে হবে, সেটাও জানতে হবে। সেই দায়িত্ব শুধু স্কুলের নয়, পরিবারকেও নিতে হবে।
তাই ভারতের জন্য হয়তো মধ্যপন্থাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত। ১৬ বছরের কম বয়সীদের পুরোপুরি সমাজমাধ্যম থেকে দূরে সরিয়ে না রেখে অভিভাবকের অনুমতি, সময়সীমা, শক্তিশালী প্রাইভেসি সেটিংস এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ কনটেন্ট নিশ্চিত করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকেও দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা সমাজমাধ্যম থাকবে কি থাকবে না, সেটা নয়। প্রশ্ন হল, আমাদের সন্তানদের হাতে আমরা কী দিচ্ছি—একটা শেখার জানালা, নাকি এমন এক ডিজিটাল গোলকধাঁধা, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন?
অস্ট্রেলিয়া একটি পথ দেখিয়েছে। ভারত সেই পথেই হাঁটবে, নাকি নিজের বাস্তবতা অনুযায়ী নতুন রাস্তা খুঁজবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হয়তো খুব দূরে নয়।