আর্মেনিয়ান স্ট্রিট। নামটা অনেকেই হয়তো শুধু রাস্তার নাম বলেই জানেন। অথচ ব্রিটিশদেরও আগেও এই শহরে এসেছিল আরমেনিয়ানরা, ব্যবসা গড়েছিল, স্কুল বানিয়েছিল এবং কলকাতার অর্থনীতি ও সমাজজীবনের সঙ্গে নিজেদের এমনভাবে জড়িয়ে ফেলেছিল যে, এখন তাদের গল্প ছাড়া শহরের ইতিহাস কখনও সম্পূর্ণ হয় না।
পারস্যের নিউ জুলফা অঞ্চল থেকে তাঁরা সিল্ক রোড ও সমুদ্রপথ ধরে এশিয়ার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন আর্মেনিয়ানরা। মসলা, রেশম, নীল, বস্ত্র, লবণ, মূল্যবান পাথর – বাণিজ্যের যে পথ, সেখানেই তাঁদের উপস্থিতি। সপ্তদশ শতাব্দীতেই বাংলায় তাঁদের বসতি গড়ে ওঠে। তখনও ব্রিটিশরা কলকাতাকে সাম্রাজ্যের রাজধানী বানায়নি। হুগলি, মুর্শিদাবাদ হয়ে তাঁরা শেষ পর্যন্ত কলকাতাকেই তাঁদের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেন।
শহরের জন্মকথার অনেক আগেই এখানে আর্মেনীয়দের পদচিহ্ন পড়েছিল। কলকাতার সবচেয়ে প্রাচীন গির্জা ‘হলি চার্চ অফ নাজ়ারেথ’ আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় তিনশো বছর ধরে। গির্জার পাশের কবরখানায় রয়েছে ১৬৩০ সালের একটি সমাধিফলক, উজাবিবে মুকিয়াসিন নামে এক আর্মেনীয় নারীর। সেটিই পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম খ্রিস্টান সমাধিফলক বলে ধরা হয়।


কলকাতার বাণিজ্যিক উত্থানের সঙ্গে আর্মেনীয় ব্যবসায়ীদের গভীর সম্পর্ক। ইউরোপ, পারস্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারতের মধ্যে বাণিজ্যের সেতুবন্ধনও তৈরি করেছিলেন তাঁরা। অনেক সময় তাঁরা ইউরোপীয় বণিকদের অনুবাদক কিংবা আর্থিক অংশীদার হিসেবেও কাজ করেছেন।
১৭৯৮ সালে একটি ছোট্ট স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করে আর্মেনিয়ান কলেজ অ্যান্ড ফিলানথ্রপিক অ্যাকাডেমি। ১৮২১ সালে সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তের আর্মেনীয় ছাত্রছাত্রীরা সেখানে প্রায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশোনা করতে আসে। শিক্ষা, থাকা-খাওয়া, সব কিছুর দায়িত্ব নেয় প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় দুশো বছর ধরে একটি স্কুল যে একটি বিচ্ছিন্ন বিশ্বসমাজকে এক সুতোয় বেঁধে রাখতে পারে, তার বিরল উদাহরণ এই প্রতিষ্ঠান।

এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কলকাতায় জন্ম নেওয়া এক কিংবদন্তি আর্মেনীয়ের নাম – স্যার ক্যাচিক পল চ্যাটার। পরে তিনি হংকংয়ের অন্যতম সফল ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী হন। নিজের শৈশবের আর্থিক সংগ্রামের কথা ভুলে না গিয়ে তিনি বিপুল অর্থ দান করেছিলেন আর্মেনিয়ান কলেজের জন্য। তাঁর সেই দান আজও পৃথিবীর নানা সংকটপীড়িত অঞ্চল থেকে আসা আর্মেনীয় ছাত্রছাত্রীদের নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ করে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আর্মেনীয় গণহত্যার এতিম শিশুরাও একসময় এই কলেজে আশ্রয় পেয়েছিল।
আজ কলকাতায় আর্মেনীয়দের সংখ্যা হাতে গোনা, হয়তো একশো বা তারও কম। তবুও এখনও গির্জায় প্রার্থনা হয়, উৎসব পালিত হয়, স্কুল চলছে। আর্মেনীয় খ্রিস্টানরা এখনও তাঁদের ধর্মীয় ঐতিহ্যে অনুযায়ী ৬ জানুয়ারি বড়দিন উদ্যাপন করেন, যা তাঁদের প্রতি বছর সেই দিন আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়।
কলকাতার রাস্তায় নানা ভাষা, নানা ধর্ম, নানা দেশের মানুষ এসে নিজেদের ইতিহাস রেখে গেছেন। আর্মেনীয়রাও তাঁদের মধ্যে অন্যতম। আর্মেনিয়ান স্ট্রিট দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাই অতিক্রম করা হয় কয়েকশো বছরের এক বিশ্বজনীন ইতিহাস, যেখানে কলকাতা আর আর্মেনিয়া এক অদ্ভুত মানবিক বন্ধনে আজও জড়িয়ে আছে।
