
একটি মেয়ে ট্রেনের জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। দূরে জল, তার উপর ডুবে থাকা রেললাইন। একটি বিশাল প্রাণী বনের ভিতর ঘুমিয়ে আছে। আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে এক অদ্ভুত দুর্গ। এই দৃশ্যগুলি যেন শেষ রাতের স্বপ্ন আর স্মৃতির মাঝে কোথাও, যেন আমরা আগে কোথাও দেখেছি, হয়তো শৈশবে, হয়তো কল্পনায়। সেই অনুভূতির স্থপতির নাম হায়াও মিয়াজ়াকি।
হয়তো এক বর্ষার বিকেলে প্রথম দেখা হয়েছিল টোটোরোর সঙ্গে। হয়তো কোনও অলস দুপুরে চিহিরোর হাত ধরে আমরা ঢুকে পড়েছিলাম আত্মা আর দেবতাদের রহস্যময় জগতে। কিংবা হয়তো আকাশে ভেসে চলা হাউলের দুর্গ দেখে মনে হয়েছিল, বাস্তবের চেয়ে কল্পনাই বেশি সত্য। মিয়াজাকির ছবিগুলি দেখার অভিজ্ঞতা পুরোনো কোনও স্বপ্নে ফিরে যাওয়ার মতো। সেই স্বপ্নে রয়েছে বিস্ময়, বিষাদ, আর এক অদ্ভুত মমতা।

১৯৪১ সালে টোকিওতে জন্ম নেওয়া মিয়াজ়াকির শৈশব কেটেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি, দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজ, উড়োজাহাজের প্রতি আকর্ষণ এবং প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ— এই সবকিছুই পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পীসত্তায় ফিরে আসে। ষাটের দশকে অ্যানিমেশন শিল্পে কাজ শুরু করে তিনি ক্রমশ জাপানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অ্যানিমেশন পরিচালকে গণ্য হন। ১৯৮৫ সালে ইসাও তাকাহাতা এবং তোশিও সুজ়ুকির সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন স্টুডিও ঘিবলি। সেই স্টুডিও থেকেই জন্ম নেয় ‘মাই নেবার টোটোরো’, ‘প্রিন্সেস মনোনোকি’, ‘স্পিরিটেড আওয়ে’, ‘হাউলস্ মুভিং কাসল্’ এবং সাম্প্রতিক ‘দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরন’-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র।
স্টুডিও ঘিবলির ইতিহাস যেন এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ইতিহাস। দ্রুতগতির বিনোদননির্ভর অ্যানিমেশনের বিপরীতে ঘিবলি বরাবরই বিশ্বাস করেছে পর্যবেক্ষণে, সূক্ষ্ম আবেগে এবং হাতে আঁকা ছবির সৌন্দর্যে। মিয়াজ়াকির প্রতিটি ফ্রেম যত্ন করে আঁকা একটি চিত্রকর্ম। বাতাসে দুলতে থাকা ঘাস, বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দ, রান্নাঘরে ফুটতে থাকা স্যুপ, এই আপাত তুচ্ছ মুহূর্তগুলিও তাঁর ছবিতে সময়ের প্রবহক, কারণ মিয়াজ়াকির কাছে জীবন বড় ঘটনার মধ্যে নয়, ছোট মুহূর্তেই লুকিয়ে থাকে।

সম্ভবত এ কারণেই তাঁর চলচ্চিত্রগুলি বয়সের সীমা অতিক্রম করতে পারে। একটি শিশু সেখানে খুঁজে পায় অভিযান এবং জাদু। একজন প্রাপ্তবয়স্ক দেখতে পান স্মৃতি, ক্ষয়, যুদ্ধ, বিচ্ছিন্নতা কিংবা বড় হয়ে ওঠার বেদনা। মিয়াজ়াকির গল্পগুলি কখনও দর্শককে ছোট করে দেখে না। তিনি বিশ্বাস করেন, শিশুরাও জটিল আবেগ বুঝতে সক্ষম।
তাঁর কাজের আরেকটি কেন্দ্রীয় বিষয় প্রকৃতি। ‘প্রিন্সেস মনোনোকি’, কিংবা ‘নওসিকা অফ দ্য ভ্যালি অফ দ্য উইন্ড’ দেখলে বোঝা যায়, প্রকৃতি তাঁর কাছে একটি জীবন্ত সত্তা। মানুষ এবং প্রকৃতির সম্পর্ককে সহাবস্থানের আবশ্যকতাকে তাঁর চলচিত্র বারবার তুলে ধরেছেন মিয়াজ়াকি। তাঁর স্মৃতিকথা ‘স্টার্টিং পয়েন্ট’-এ তিনি লিখেছেন, “অরণ্য আর আমার হৃদয়ের অন্ধকারের এক গভীর সংযোগ আছে। আমার মনে হয়, যদি সেই অরণ্য মুছে যায়, তবে আমার হৃদয়ের সেই অন্ধকারও বিলীন হয়ে যাবে, আর আমার অস্তিত্ব হয়ে উঠবে আরও অগভীর ও ভিত্তিহীন।”

আধুনিক জীবনের অধিকাংশ অভিজ্ঞতাই আজ তথ্য এবং যুক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু মিয়াজ়াকির জগতে এখনও রহস্যের জন্য জায়গা আছে। সেখানে সবকিছুর উত্তর জানা জরুরি নয়। বরং অজানার সঙ্গে সহাবস্থান করাটাই জীবনের বাস্তব। মিয়াজ়াকির কথায়, “অশুভকে তুলে ধরা এবং তারপর তাকে ধ্বংস করার ধারণাটি মূলধারার চিন্তাধারায় বিবেচিত হলেও, কিন্তু আমার কাছে এটি একেবারেই পচে যাওয়া একটি ধারণা। এই বিশ্বাস যে যখনই কোনো অশুভ ঘটনা ঘটে, তখন তার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়ী করা যাবে এবং তাকে শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে, সেটা জীবনে হোক বা রাজনীতিতে, আমার কাছে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত দুরাশা বলেই মনে হয়।
মিয়াজ়াকি আমাদের নতুন কোনও পৃথিবী উপহার দেন না। বরং এই পৃথিবীকেই নতুন চোখে দেখতে শেখান। তাঁর ছবির পর বন আর শুধু বন থাকে না, বাতাস আর শুধু বাতাস থাকে না, আকাশও আর কেবল আকাশ থাকে না। তাদের প্রত্যেকেরই যেন একটি নিজস্ব গল্প আছে। আর সেই গল্প শোনার জন্যই বারবার ফিরে আসা যায় মিয়াজ়াকির কাছে।

ছবি সৌজন্য: ওয়াগনার ডিজ়েল।