
অগ্নি: সত্তরের দশকে পিকনিক পার্ক ছিল পুকুর আর মাঠে ভরা একটা এলাকা। একটা আউটহাউস-ওলা ব্রিটিশ আমলের পিকনিক করার জায়গা। পরে আনন্দ মুখার্জি নাম এক ব্যবসায়ী সেই আউটহাউসটি কিনে নেন এবং বসবাস শুরু করেন। কয়েকটা পুকুর পরে বোজানো হয়। তার জায়গায় হয় প্রায় ৫-৬টা খেলার মাঠ। আমি পিকনিক পার্কে যাই ১৯৭৮ সালে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের ছোটবেলাটা ছিল মাঠকেন্দ্রিক। শীতে ক্রিকেট। প্রবল বৃষ্টিতে মাঠ ভেসে না যাওয়া অবধি ফুটবল। পাশাপাশি দুই কলোনি, সুনীলনগর এবং বিজয়নগরের ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলো।
ট্রামলাইন: ফুটবল নিয়ে তখন কেমন আগ্রহ ছিল পিকনিক পার্কে?
অগ্নি: যেহেতু কলোনি কেন্দ্রিক জায়গা, পিকনিক পার্কের মানুষজন অধিকাংশই পূর্ববঙ্গের থেকে এসেছেন। ফলে তারা যে রক্তমজ্জায় ইস্টবেঙ্গল সমর্থক, সেটাই স্বাভাবিক। সুতরং বড় ম্যাচের (তখন কেউ ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচকে ডার্বি বলত না) কয়েকদিন আগে থেকেই একটা ফুটবল জ্বরের আবির্ভাব হত।

ট্রামলাইন: বিশ্বকাপ নিয়ে তোমার আগ্রহ শুরু কীভাবে?
অগ্নি: ১৯৮২-র বিশ্বকাপ নিয়ে আমাদের অতটা স্মৃতি নেই
। বিশ্বকাপ নিয়ে উত্তেজনা শুরু হল ১৯৮৬ সালে, যে বার প্রথম বিশ্বকাপের লাইভ টেলিকাস্ট টিভিতে দেখানো হল। খুব কম বাড়িতে এবং কিছু ক্লাবঘরে সাদাকালো টিভি ছিল। সেখানে জড়ো হয়ে খেলা দেখা শুরু। আমাদের পাড়ার ক্লাব আনন্দ আরতিতে যেমন ছোটবড় মিলে আমরা দেখতাম। তখন আমরা স্কুলে পড়ি। খবরের কাগজ এবং খেলা পত্রিকার দৌলতে সাদাকালো ছবি দেখে আমরা তখন কেউ ইতালি, কেউ জার্মানি কেউ বা ব্রাজিলের সাপোর্টার। ১৯৮৫তে নেহেরু কাপ হয়েছিল। সেখানে খেলে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার বুরুচাগা, উরুগুয়ের ফ্রান্সিসকোলির মত তারকারা। তখন আমাদের খেলার মাঠেও কারও নাম হয়ে গেছিল বুরুচাগা, কারও বা ফ্রান্সিসকোলি!
ট্রামলাইন: মারাদোনার বিশ্বকাপে পিকনিক পার্কের হালচাল কেমন হয়েছিল, যদি বল …

অগ্নি: ১৯৮৬-র বিশ্বকাপ একটা অন্যরকম প্রভাব ফেলেছিল আমাদের পিকনিক পার্কের ফুটবলপ্রেমী মানুষদের মধ্যে। খেলা দেখার পর চায়ের দোকানে দেদার আড্ডা এবং সমালোচনা করছে এমন সব মানুষ, যারা আদতে ময়দানে গিয়েও কোনোদিন খেলা দেখেনি। সবার মধ্যে অদ্ভুত উন্মাদনা। আর সবার আলোচনার অন্যতম বিষয় দিয়েগো মারাদোনা। হ্যান্ড ওফ গড-এর গোলটায় কি আদৌ মারাদোনার হাত লেগেছিল – এই নিয়ে কত তর্ক। যেদিন ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার ম্যাচ হচ্ছে, সেদিন আমরা আনন্দ-আরতী ক্লাবে বসে খেলা দেখছি। নোনা দেওয়াল, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ। তারমধ্যে চিৎকার। মারাদোনার সেই ৫-জনকে ড্রিবল করে গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি। মারাদোনায় সেদিন থেকে যেন নেশা লেগে গেলো। অনেক ব্রাজিল সাপোর্টাররা যেন সেদিনের পর আর্জেন্তিনার দিকে একটু হলে ঝুঁকেছিল।
ট্রামলাইন: ১৯৯০-এ মারাদোনার স্বপ্নভঙ্গ- কতটা আবেগে ভেসেছিল পিকিনি পার্ক?
অগ্নি: ১৯৯০ সালে তখন অনেক বাড়িতে কালার টিভি। সেবার রবার্তো বাজ্জোর পেনাল্টি মিসের পর পিকনিক পার্কের কলোনি গেটে ভিড় জমে গেল। সে ভিড় শোকের। এতটাই এফেক্ট বিশ্বকাপের। আর আর্জেন্তিনা হেরে যাওয়ার পর মারাদোনা যখন সাংবাদিক সম্মেলন করে খেলা ছাড়ছেন, সেদিন পিকনিক পার্কে পাড়ার বন্ধুবান্ধবের অনেকেই কান্না আটকে রাখতে পারেনি। আমাদের বন্ধু মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ রাজু পাড়ার সেরা মাতাল! সেদিন এমনিতেই সবার মন খারাপ। রাজুর সেদিন অঝোরে কান্না। তার তিন হিরো – কিশোরকুমার, বচ্চন, আর মারাদোনা। তার মধ্যে দু’জনই চলে গেল! কী নিয়ে থাকযে সে। এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল মানুষজন।
ট্রামলাইন: ৯৪-এ ব্রাজিল, ‘৯৮-এ ফ্রান্স – বিশ্বকাপের কেমন ইফেক্ট ছিল পিকনিক পার্কে?
অগ্নি: ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের সময় মানুষ ইউরোপের লা লীগা, ইপিএল ইত্যাদি দেখা শুরু করে দিয়েছে। শুরু হয়েছে কার্ডবোর্ডে পোস্টার সেঁটে, তাতে মালা পড়িয়ে উন্মাদনা। ১৯৯৮-এর বিশ্বকাপের সময় আমি ‘সংবাদ প্রতিদিনে’ চাকরি করি। সিনিয়র জয়ন্ত চক্রবর্তী ফ্রান্স গেছেন বিশ্বকাপ কভার করতে। রোজ ভোর ৫টায় রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন। সেবার কাজের তাগিদে খেলা দেখার আনন্দটাই চলে গেছিল। তবে ফাইনালের দিন ছুটি নিলাম। ব্রাজিল ফাইনালে। আমার বাড়িতে বন্ধুবান্ধব এলো। এক সঙ্গে খেলা দেখা হবে। কিন্ত স্বপ্ন ভেঙে দিলেন জিনেদিন জিদান। পিকনিক পার্কে যেন জাতীয় শোক শুরু। রাস্তায় লোক বেরিয়ে পড়েছে। মুখে কোনও কথা নেই। আমরা হটসিটে হাঁটতে গেলাম পিকনিক গার্ডেনের ইমাজিনারি সীমানা বন্ডেল গেটের লেভেল ক্রসিংয়ের কাছে। তারপর সে এক অন্য গল্প।
ট্রামলাইন: দিল্লিতে আসার পর বিশ্বকাপ কতটা প্রভাব ফেলে?
অগ্নি: দিল্লিতে আসার পর সারা বছর অতটা খেলা দেখা হয়না। বিশ্বকাপ শুরু হলে একটু একটু করে আগ্রহ বাড়ে এবং এখন ছেলের সঙ্গে বসে খেলা দেখি। পিকনিক পার্কে তৈরি সেই অভ্যেস কী সহজেই ঝেড়ে ফেলা যায়?