শঙ্করনামা: জগৎ মুখার্জি পার্ক স্মরণ করল পন্ডিত উদয়শঙ্করকে

লিখছেন সৌম্যা ঘোষ
গিরীশচন্দ্র ঘোষের বাড়ি পেরিয়ে রামকৃষ্ণ মঠ-বোরোলিন হাউজ় ছাড়ালেই একটা পুরোনো বাড়ির তলায় চায়ের দোকান, সেখানে প্রবীণদের আড্ডা। চারপাশটা উনুনের ঝাপসা ধোঁয়ায় ঢাকা… শীতকালে এই জায়গাটাকে বড় মায়াময় লাগে…
ওখানেই চা, কড়া করে স্যাঁকা বাটার-টোস্টে কামড় দিতে দিতে চলছে বাজার গরম করা রাজনীতির খোশগল্প— পুজোর অনুদান, পুজোর ক্লাবগুলোয় বিদ্যুতের বিলে ছাড়, কার্নিভালের বদলে ইডেন গার্ডেন্সের অনুষ্ঠান ইত্যাদি…
এর অদূরেই একটা মাঠ— জগৎ মুখার্জি পার্ক। এবারের থিম ‘শঙ্করনামা’।
উদয়শঙ্করের জন্মের ১২৫ বছর। সেই উপলক্ষেই এ বারের ভাবনায় ভারতীয় নৃত্যজগতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব উদয়শঙ্কর।
উদয়শঙ্করের জীবন ও শিল্পভাবনা নিয়ে নতুন করে সচেতনতা তৈরি করা উদ্যোক্তাদের মূল লক্ষ্য।
ভাবনা ও পরিকল্পনার দায়িত্বে অভিজিৎ ঘটক। তাঁর দাদা ছিলেন ‘উদয়ন’র ছাত্র। দাদার কাছে নাচ শিখতে এসেই উদয়শঙ্কর নৃত্যধারার সঙ্গে তাঁর পরিচয়। জানিয়েছেন, ‘উদয়শঙ্করের জার্নি যেমন আঁকা থেকে নাচে, আমার বিষয়টা কিন্তু উল্টো। নাচ শিখতে এসে আঁকা আর তা নিয়েই পড়াশোনা…’
পুজো কমিটির অন্যতম উদ্যোক্তা রাজা মুখার্জি ট্রামলাইনকে জানালেন, ‘আজকের প্রজন্মের অনেকের কাছেই উদয়শঙ্কর নামটি খুব বেশি পরিচিত নয়। অবশ্য, এই থিম কোনও বড় পরিবর্তন ঘটাবে, এমনটাও নয়। অন্তত কিছু মানুষের মধ্যে উদয়শঙ্করকে নিয়ে আরও পড়াশোনা-নাচের আগ্রহ তৈরি হোক, এটাই আমরা চাই।’
যদিও তিনি জানান, জগৎ মুখার্জির থিমের ভাবনায় প্রথমে ছিল উদয়শঙ্করের ছবি ‘কল্পনা’। পরে বুঝতে পারেন, শুধুমাত্র ‘কল্পনা’-কে ভিত্তি করলে উদয়শঙ্করের কাজ ও জীবন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। তাই, তাঁর সামগ্রিক শিল্পচর্চা, জীবন এবং নৃত্যভাবনাকেই থিমের পরিসরে নিয়ে আসা হয়।

এই বিষয়ে ট্রামলাইনকে মমতাশঙ্কর জানান, ‘উত্তর কলকাতার জগৎ মুখার্জি পার্ক পুজো কমিটি দু’মাস আগে আমাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁরা জানান, এ বছরের পুজোয় বাবার জীবন ও শিল্পকে থিম করে পুজো মণ্ডপ সাজাবেন। এ কথা শুনে আমাদের যে রকম অবাক লেগেছে, সে রকম ভালোও লেগেছে আর খুশিও হয়েছি।
তবে, একটা টেনশনও কাজ করেছে। এত বিরাট একটা পরিধি… সেটা কেমন ভাবে হবে আমি জানতে উৎসুক।
আমি এবং আমার স্বামী চন্দ্রোদয় যতটা পারি সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।
কিন্তু বাবার ব্যবহৃত কোনও জিনিসপত্র আমাদের কাছে নেই। প্রচুর জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। সেই কংগ্রেস আমল থেকে আজ অবধি মা সবার কাছে আর্তি জানিয়েছিলেন, যে করে হোক উদয়শঙ্করের জিনিসপত্রগুলি সংরক্ষণ করা হোক।
আজ সেই সব জিনিসপত্র কোথায় কার বা কাদের কাছে রাখা আছে জানি না। শত অনুরোধেও জিনিসগুলি সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়নি।
শুধুমাত্র বাবার ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রগুলি বেঙ্গালুরুতে সত্য সাঁইবাবার মিউজিয়ামে রাখা আছে। কিন্তু বাদবাকি বহু জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে। কিছূ অন্যদের কাছেও আছে। তবে কার কাছে কী সামগ্রী আছে অজানা। সেগুলো যদি সংরক্ষিত হত, তা হলে জগৎ মুখার্জি পার্কের মণ্ডপ সজ্জা সত্যি আরও বেশি তথ্যসমৃদ্ধ হতো।
বাবার অনেক ছবি এবং চিঠি আছে। ছবিগুলি ডিসপ্লে করা যেতে পারে। কিন্তু চিঠি খুব ব্যক্তিগত জিনিস। সেগুলো তো মেলে ধরা যায় না।
বাবার স্মৃতি দিয়ে পুজো মন্ডপ কেমন ভাবে সাজানো হচ্ছে এখনও দেখতে যাওয়া হয়নি। তাঁরা যেদিন বলবেন সেদিনই যাব।’
বিশ্বের দরবারে বাঙালির নাচও যে আন্তর্জাতিক মানের হতে পারে, তা প্রমাণ করেছিলেন পন্ডিত উদয়শঙ্কর। অমলাশংকর সেই ধারাই আপামরের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর সৃজনশীল নৃত্যধারা দেখিয়েছিল, শরীর দিয়েও সুরকে রূপ দেওয়া যায় অন্যভাবে। শরীর-মন-বুদ্ধিমত্তা দিয়েই তৈরি হয় একটা নাচ।
তবে, জগৎ মুখার্জি পার্কের এই থিমের মধ্যেই উদয়শঙ্কর-অমলাশঙ্করকে আটকে না রেখে তাঁর নৃত্যধারা-কাজ উত্তর কলকাতা, কলকাতার বাইরে সারা ভারতে একই ভাবে চর্চায় যেন সাড়া পাক, এই দাবি তাঁর অনুরাগীদের। তবেই সচেতন হবে নবীন প্রজন্ম-পরবর্তী প্রজন্ম।
কৃতজ্ঞতা: সংযুক্তা বসু