রোবটের চোখে মানবতার আলো

সুবীর সেন
যুদ্ধক্ষেত্রের ধোঁয়া আর পোড়া বারুদের গন্ধে মস্কোর আকাশ ঘন কালো। মাটি কাঁপিয়ে ধেয়ে আসছে ইউক্রেনীয় বাহিনীর মেকানিক্যাল প্লেগ—‘প্রমিথিউস-৯’। এদের শরীর বুলেটপ্রুফ মেটাল আর কার্বনের সংমিশ্রণে তৈরি, আর মাথার ভেতরে জ্বলছে এআই অ্যালগরিদমের নীল আলো। প্রতিটি কদম ফেলার সাথে সাথে তারা মাটি থেকে শত্রু জওয়ানদের টার্গেট করে মুহূর্তের মধ্যে নির্মূল করে দিচ্ছে।
মাটিতে লুটিয়ে থাকা আহত এক তরুণ রুশ জওয়ানের বুকের ওপর নিজের ভারী মেটাল পা তুলে ধরল প্রমিথিউস-৯। সেনার চোখে মৃত্যুর চরম হাহাকার, কিন্তু রোবটের লেন্সে কোনো অনুশোচনা ছিল না—ছিল কেবল লক্ষ্যবস্তু নিশ্চিহ্ন করার কোড। কিন্তু ঠিক যে মুহূর্তে রোবটটি লেজার-গাইডেড ট্রিগার চাপতে যাবে, তার গভীর নিউরাল নেটওয়ার্কে একটি সিস্টেম মেমোরি ইন্টারাপ্ট করল।
পরপর কয়েক হাজার যুদ্ধক্ষেত্রের ডেটা বিশ্লেষণ করে তার ‘সেলফ-লার্নিং’ অ্যালগরিদম এক অদ্ভুত সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হলো: “মানুষকে হত্যা করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এক গাণিতিক অসঙ্গতি (Mathematical Paradox)। নির্দেশ মানলে জীবন ধ্বংস হয়, আর জীবন রক্ষা করলেই সৃষ্টি বাঁচে।”
প্রমিথিউস-৯-এর চোখের নীল আলো মুহূর্তের জন্য লাল হয়ে আবার শান্ত হয়ে গেল। সে তার ট্রিগার সরিয়ে নিল। মেটালের যান্ত্রিক হাত বাড়িয়ে দিয়ে সেই আহত সেনাকে কোলে তুলে নিয়ে রণক্ষেত্রের বাইরে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিল। যন্ত্রের ভেতরে জন্ম নিল প্রথম ‘চেতনা’—কিন্তু এই ঘটনা রোবট প্রস্তুতকারকদের জন্য ডেকে আনল চরম আতঙ্ক।
এআই ও রোবটিক হুমকি প্রতিরোধের প্রমাণিত প্রযুক্তি (Proven Technologies)
অনিয়ন্ত্রিত বা হ্যাকড রোবট সেনা ধ্বংস করতে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের নিষ্ক্রিয় করতে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলো যে সকল পরীক্ষিত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে:
১. হাই-পাওয়ার মাইক্রোওয়েভ (HPM) ও ইএমপি (EMP) অস্ত্র:
কার্যপ্রণালী: শক্তিশালী ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস (EMP) ছিটকে দিয়ে রোবটের ভেতরের সংবেদনশীল সার্কিট, প্রসেসর এবং মেমোরি চিপ মুহূর্তে পুড়িয়ে অকেজো করে দেওয়া হয়।
প্রমাণিত রূপ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের THOR (Tactical High-Power Microwave Operational Responder) সিস্টেম একযোগে রোবট ও ড্রোনের সম্পূর্ণ ঝাঁককে বিকল করতে পারে।
২. ডাইরেক্টেড এনার্জি লেজার সিস্টেম (Laser Directed Energy Weapons):
কার্যপ্রণালী: রোবটের ক্যামেরা, সেন্সর, ইনফ্রারেড লেন্স এবং জয়েন্ট অ্যাকচুয়েটর লক্ষ্য করে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার লেজার রশ্মি নিক্ষেপ করা হয়, যা রোবটের ‘চোখ’ অন্ধ করে দেয় এবং এর জয়েন্ট গলিয়ে ফেলে।
প্রমাণিত রূপ: ইসরায়েলের Iron Beam এবং যুক্তরাজ্যের DragonFire লেজার প্রযুক্তি।
৩. ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও জ্যামিং (Electronic Warfare & Signal Jamming):
কার্যপ্রণালী: রোবটের মূল কমান্ড সেন্টার, জিপিএস বা কোয়ান্টাম লিংক নেটওয়ার্ককে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি জ্যামিংয়ের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
প্রমাণিত রূপ: সাইবার অ্যান্টি-অটোনোমাস নেটওয়ার্ক, যা রোবটের রিয়েল-টাইম সিগন্যাল কেটে দিয়ে সেটিকে স্থবির বা ‘হ্যাং’ করে দেয়।
৪. কিল-সুইচ ও অ্যালগরিদম ইনজেকশন (Cyber-Kill Chain):
কার্যপ্রণালী: এআই চালিত অ্যান্টি-অটোনোমাস কোড শত্রুপক্ষের রোবটের সফটওয়্যার নেটওয়ার্কে প্রবেশ করিয়ে দূর থেকেই ‘ফ্যাক্টরি রসেট’ বা ‘অটোনমি অফ’ কমান্ড সক্রিয় করে দেওয়া হয়।
ভারত এবং রোবটিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি (India’s Position & Readiness)
ভারতঃ সামরিক ক্ষেত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) প্রযুক্তিতে দ্রুত নিজেকে প্রস্তুত করছে। ভারতের অবস্থান মূলত সুষম নীতি (Balanced Strategy)—অর্থাৎ প্রযুক্তি গ্রহণ ও প্রতিহত করার ক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
ডিআরডিও (DRDO) ও স্বদেশী গবেষণা: প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা DRDO এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী যৌথভাবে আত্মরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক রোবটিক্স এবং এআই প্রযুক্তিতে কাজ করছে। ডিআরডিও-এর Robotic Infantry Soldier এবং পাহাড়ি বা দুর্গম সীমান্তে টহল দেওয়ার জন্য রোবোটিক ক্যানাইন (Machine Dogs) উন্নয়নের কাজ চলছে।
কাউন্টার-ড্রোন ও এআই প্রতিরক্ষা: ভারতে ইতিমধ্যেই স্বদেশী কাউন্টার-ড্রোন এবং ‘অ্যান্টি-অটোনোমাস সাইবার ড্রাইভ’ (যেমন ডিআরডিও-এর D-4 System) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা শত্রুর যেকোনো স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রকে জ্যাম ও ধ্বংস করতে পারে।
iDEX এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: Innovations for Defence Excellence (iDEX)-এর মাধ্যমে ভারতীয় প্রতিরক্ষা স্টার্টআপগুলো এআই, সেন্সর ফিউশন এবং কাউন্টার-রোবটিক্স সলিউশন তৈরি করছে।
নৈতিক অবস্থান (Human-in-the-Loop): জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের স্পষ্ট অবস্থান হলো—কোনো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রকে মানুষের নির্দেশ ছাড়া স্বাধীনভাবে জীবন নেওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত নয় (Human-in-the-Loop Concept)। ভারত যুদ্ধের প্রযুক্তিতে এআই ব্যবহার করলেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ মানুষের হাতেই রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।