ঝাপসা চোখে দেখা, সেই শহর
অভিজিৎ বসু
আগে যা ঘটেছে : অর্পণ চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে শেষবারের মতো। ছেড়ে যাচ্ছে শৈশব, যৌবনের স্মৃতিকে পিছনে ফেলে। ফেলে যাচ্ছে তাদের আদি বাড়ির নোনাধরা দেওয়াল, শ্যাওলাপড়া উঠোন আর ইটের ফাঁকে-ফাঁকে রেখে যাওয়া প্রায় দু’শো বছরের ইতিবৃত্ত, চাপা কান্নাকে। এক মায়াবী শৈশবের কথা বলতে চেয়ে কিছু কথা লিখে ফেলেছিল সে। কুলুঙ্গির ধুলো ঝেড়ে আবার শুরু করল সেই আপন অক্ষরের পাঠ, যার প্রথম পর্ব হাজির হয়েছিল গত সপ্তাহে। আজ পরের কিস্তি, যেখানে আলাপ জমবে অর্পণের থেকে বয়সে খানিক বড় এক ফুটবল-পাগল কিশোরের সঙ্গে। আসুন, পড়ে ফেলি দ্বিতীয় পর্বের ‘…ঝাপসা চোখে’।
২
ছোট্ট ছেলেটা নাচছে। একলা দোহারা চেহারার ছেলেটা নাচছে এবং নাচাচ্ছে। সকাল এখনও ভোরের কুয়াশার চাদর সরিয়ে মুখ দেখায়নি। আশপাশের বাড়ির রান্নাঘরে এখনও জ্বলে ওঠেনি উনুন। গোয়ালা রামপেয়ারি দুধের বালতি হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়েনি। রাস্তার কলে জল এসে গেলেও গাড়ি ধোয়ার বাচ্চা ছেলেটা এখনও জল ধরতে এসে দাঁড়ায়নি। সেই দোহারা ছেলেটা নেচে চলেছে এবং নাচিয়ে চলেছে! কিছুটা দূর থেকে গোয়েন্দার দৃষ্টিতে তাকে লক্ষ করছে এক মাঝবয়সি। ভোরের প্রথম কাকটা গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। হরিণঘাটার ভ্যান এসে থামল ডিপোয়। দুই মুঠোয় গম ভরে বিহারি অর্জুন পায়রাদের খাওয়ানোর জন্য শিবমন্দিরের দিকে হাঁটা দিতে লাগল। ছোট্ট ছেলেটা একটা ফুটবল প্রথমে পায়ের চেটো, তারপর হাঁটু থাই হয়ে কাঁধ থেকে মাথা, মাথা থেকে আবার পায়ের চেটোয় নামিয়ে কোনও এক কাল্পনিক তেকাঠি-কে তাগ করে প্রবল বেগে শট নিতে শুরু করল। মাঝবয়সি গোয়েন্দা এবার নিজে থেকেই সেই কাল্পনিক তেকাঠির নীচে এসে দাঁড়াল, যেন লেভ ইয়াসিন। কিন্তু বল তো আজকে ইউসেবিও-র পায়ে! এক-একটা শট কামানের গোলার মতো আছড়ে পড়তে থাকল সেই কাল্পনিক তেকাঠির গায়ে জড়ানো অদৃশ্য জালে! কিছুক্ষণ এইভাবে চলার পর গোয়েন্দা গোলকিপার একটা বাঁশি প্যান্টের পকেট থেকে বের করে বাজিয়ে দিল। ছেলেটার দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল এই বলে যে, দশটা পেনাল্টির মধ্যে দশটাই গোলে ঢোকাতে পারলে কাশী-র দোকানে ঘুগনি-পাউরুটি খাওয়াবে।

ছবি @ অমিত ধর
একদল কাঁসারি বউ হরিনাম সংকীর্তন করতে-করতে জগন্নাথ ঘাটের দিকে হাঁটা দিল। প্রথম শট : মাঝবয়সিকে কোনো সুযোগ না দিয়েই ডানদিকের বারপোস্ট ছুঁয়ে বল ঢুকল গোলে। দুই, তিন, চার— সবক’টাই গোলকিপারকে প্রায় দর্শকের মতো দাঁড় করিয়ে জালে বল ঢোকাল ছেলেটা! গঙ্গার কলে পাইপ লাগিয়ে ভিস্তিওলা রাস্তা ধুচ্ছে। পাঁচ নম্বরটা গোলকিপারের মাথার ওপর দিয়ে লব করল ছেলেটা। তারপর এক-এক করে ছয়, সাত— গোলের পর গোল। আট নম্বরে আরও সজাগ হবার চেষ্টা করল গোলকিপার। কিন্তু দোহারা ছেলেটাকে কোনোভাবেই আটকানো যাচ্ছে না আজ। ন-নম্বরের জন্য প্রস্তুত ওরা। গোলকিপার কি পারবে আটকাতে? হঠাৎ দূরে কোথাও একটা গাড়ির আওয়াজ! বিবেকানন্দ রোডে? কর্পোরেশনের বাতিবাবু আলো নেভাতে এসেছে। দূর থেকে কিছু পায়ের আওয়াজ, ভারী বুটের শব্দ, ক্রমশ এগিয়ে আসছে, নিচু স্বরে কারা যেন কথা বলছে! বিবেকানন্দ রোড থেকে তারক প্রামাণিক রোড হয়ে সিমলা ব্যায়াম সমিতির মাঠ অবধি আসতে বড়জোর মিনিটখানেক লাগার কথা। এবার ওদের দেখা যাচ্ছে— একজন চেঁচিয়ে উঠল ‘ওই তো শুয়োরের বাচ্চা নকশালটা! সকাল-সকাল ছোট ছেলেটার মাথা খাচ্ছে’; আরেকজন বলে উঠল ‘ধর শালাকে!’ বাচ্চা ছেলেটার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল— ‘পালাও, পালাও সতুদা।’ মাঝবয়সি সতুদা দৌড়চ্ছে, সামনে তারক প্রামাণিক রোডের দিকে যাবার উপায় নেই, ওদিক থেকেও কারা যেন এগিয়ে আসছে! মেহতা বাড়ির পাঁচিল টপকাতে পারলেই রাজবংশীদের বস্তি, প্রাণপণ দৌড়চ্ছে সতুদা পাঁচিলটার দিকে। খটাস্ করে একটা শব্দ হল আর সতুদা পড়ে গেল। ছোট্ট ছেলেটা ‘মাগো’ বলে চোখ বন্ধ করল!