যে রাতে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল ভারতের সিলিকন ভ্যালি- মহালির এক হারিয়ে যাওয়া রহস্য

সুবীর সেন
১৯৮৯ সালের মহালি সেমিকন্ডাক্টর ল্যাব অগ্নিকাণ্ড: ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব ধ্বংসের এক অলিখিত ট্র্যাজেডি
১. হারানো সাম্রাজ্য: অগ্নিকাণ্ডের আগের ভারত
আশির দশকের শেষভাগ। পঞ্জাবের মহালি শহরের নির্জন রাতে একটি বহুতল ভবনের বন্ধ জানালার ওপারে
জ্বলছিল নরম নীলচে আলো। বাইরের পৃথিবীর মানুষ জানত না, এই চত্বরের ভেতরে রচিত হচ্ছিল এক অলিখিত
বিপ্লব। এটি কোনো সাধারণ কারখানা ছিল না—সেটি ছিল Semiconductor Complex Limited (SCL)।
এমন এক সুরক্ষিত দুর্গ, যার বাতাস সাধারণ বাইরের বাতাসের চেয়ে লাখ গুণ বেশি বিশুদ্ধ। সেখানে সাদা বিশেষ
পোশাক পরা বিজ্ঞানীরা সিলিকন ওয়াফারের ওপর আলোর রেখা দিয়ে এঁকে চলছিলেন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে
জটিল ও সূক্ষ্ম নকশা—মাইক্রোচিপ। তখনও তাইওয়ানের TSMC বিশ্বজুড়ে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করতে
পারেনি। চীন সেমিকন্ডাক্টরের “স”-ও জানত না। আর ঠিক সেই সময় ভারত প্রস্তুত হচ্ছিল বিশ্ব প্রযুক্তির
সিংহাসন দখল করতে।
তাইওয়ান ও চীনের চেয়ে এগিয়ে : ১৯৮৭ সালে যখন তাইওয়ানের TSMC সবে যাত্রা শুরু করছে এবং চীন
সেমিকন্ডাক্টরে নামেনি, তখন ভারত ইতিমধ্যে নিজের দেশে চিপ তৈরি করছিল।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তি : মহালির SCL কমপ্লেক্স ৫-মাইক্রন এবং ৩-মাইক্রন প্রসেসে সিলিকন ওয়াফার ও মাইক্রোচিপ তৈরি করত এবং ১.২-মাইক্রন প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছিল। তৎকালীন বিশ্বসেরা টেক জায়ান্টদের থেকে ভারত মাত্র এক থেকে দুটি ধাপ পেছনে ছিল।
দেশীয় স্বয়ংসম্পূর্ণতা: ভারতের টেলযোগাযোগ, মহাকাশ গবেষণা (ISRO), প্রতিরক্ষা খাত (DRDO)এবং (SCL Unicorn )নামের দেশীয় কম্পিউটারের চিপ এখান থেকেই সরবরাহ করা হতো।
২. অভিশপ্ত সেই রাত: ৭ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯
১৯৮৯ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারির হাড়কাঁপানো শীতের রাতে সেই স্বপ্নের ওপর নেমে এলো এক বিভীষিকা। রাত
তখন ১১টা ৪০ মিনিট। মহালি কমপ্লেক্সের গভীরে, যেখানে Class 100 Cleanroom-এর অতি-সংবেদনশীল
বায়ুমণ্ডল নিয়ন্ত্রণ করা হতো, সেখানে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ল পরিবেশ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা। চিপ তৈরির পরিবেশ সাধারণ কারখানা থেকে সম্পূর্ণ
আলাদা—এটি একটি জীবাণুমুক্ত পরিবেশ, যেখানে বাতাসের একটি ধূলিকণাও চিপ নষ্ট করে দিতে পারে।
সিলিকন ওয়াফার তৈরির জন্য ব্যবহৃত অত্যন্ত উদ্বায়ী গ্যাস ও কেমিক্যালের পাইপলাইনে দেখা দিল
অগ্নিকাণ্ড। কিন্তু এটি সাধারণ আগুন ছিল না—উচ্চমাত্রার অক্সিজেন ও অতি-বিশুদ্ধ কেমিক্যালের
সংস্পর্শে এসে বায়ু চলাচলের ডাক্টগুলো যেন একেকটি হিমালয়সম ব্লোটর্চে পরিণত হলো।
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের দেয়াল ও কাঁচ গলে যেতে লাগল। সিলিকন ফ্যাব্রিকেশন লাইন, আলোক-লিথোগ্রাফির
কোটি কোটি টাকার ইম্পোর্টেড মেশিনারি (প্রায় ৭৫ কোটি টাকা, যা আজকের মূল্যে কয়েক হাজার কোটি
টাকার সমান), আর ভারতীয় বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছর ধরে জমানো গবেষণা—সব কিছু গ্রাস করে নিল এক
জ্বলন্ত দানব। পরদিন সকালে যখন ধোঁয়া শান্ত হলো, তখন দেখা গেল ভারতের প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের
মূল স্তম্ভটি এক স্তূপ ছাই ছাড়া আর কিছুই নয়।
৩. দুর্ঘটনা নাকি সূক্ষ্ম চক্রান্ত?
আগুনের লেলহান শিখা নেভার পর থেকে শুরু হলো এক সুগভীর রহস্যের অধ্যায়। সরকার গঠিত মোহিলে কমিটি (মেজর জেনারেল এস. এ. মোহিলে) তদন্ত শেষে জানাল—মেজানাইন ফ্লোরের একটি বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট
থেকেই এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত।
কিন্তু ভেতরের মানুষদের মনে প্রশ্ন রয়েই গেল। আশির দশকের শেষের দিকে পঞ্জাব রাজনৈতিকভাবে
অত্যন্ত অস্থির ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, ভারত তখন প্রতিরক্ষা, মহাকাশ গবেষণা ও যোগাযোগ খাতে সম্পূর্ণ
আত্মনির্ভরশীল হওয়ার ঠিক দৌড়গোড়ায় দাঁড়িয়েছিল। যে প্রযুক্তি ভারতকে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর
সমকক্ষ করে তুলতে পারত, এক রাতে তা ছাই হয়ে যাওয়া কি স্রেফ একটি দুর্ঘটনা&? নাকি এর পেছনে ছিল
কোনো বিশ্বরাজনৈতিক অদৃশ্য হাতের খেলা? উত্তরটি আজও ইতিহাসের অন্ধকারের ভেতরেই ঢাকা রয়ে গেছে।
৪. সময়ের গোলকধাঁধায় ১২ প্রজন্ম পেছনে
সেমিকন্ডাক্টর দুনিয়ার সময় সাধারণ ঘড়ির কাঁটায় চলে না; তা চলে মুর-এর নিয়ম মেনে—যেখানে প্রতি দেড় থেকে দুই বছরে প্রযুক্তি দ্বিগুণ উন্নত ও ছোট হয়। মহালির ছাইয়ের মধ্য থেকে ভারতকে তুলে দাঁড় করাতে সরকারি আমলাতন্ত্র আর লালফিতার দৌরাত্ম্যে সময় লেগে গেল দীর্ঘ আট বছর (১৯৯৭ সাল)।
| সময়কাল | মহালি (SCL ভারত) | বিশ্ববাজার (Intel /TSMC) | প্রযুক্তিগত ট্র্যাজেডি |
| ১৯৮৯ (আগুনের আগে) | ৩-মাইক্রন (3000nm) | ১.৫ – ১.০ মাইক্রন | বিশ্বসেরাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছিল ভারত |
| ১৯৮৯ – ১৯৯৭ | সম্পূর্ণ স্থবির | ন্যানোমিটার (nm) বিপ্লব | এক ভয়াবহ প্রযুক্তিগত শূন্যতা |
| ১৯৯৭ (পুনরায় চালু) | ০.৮-মাইক্রন (800nm) | ১৮০nm – ১০০nm চিপ | ভারত চলে গেল ১২ প্রজন্মের বেশি পেছনে |
যখন ১৯৯৭ সালে কারখানাটি আবার চালু হলো, ততদিনে বিশ্ব অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ভারত যেখানে ৮০০
ন্যানোমিটারে আটকে রইল, বিশ্ব তখন ন্যানোমিটারের সূক্ষ্মতম প্রসেসে পৌঁছে গেছে। ভারত এক রাতে
পিছিয়ে গেল ১২টি প্রযুক্তিগত প্রজন্ম।
৫. মেধা পাচার এবং এক অলিখিত ইতিহাস
মহালির সেই ছাই থেকে শুধু যন্ত্রপাতি নয়, ডানা ভেঙে গিয়েছিল ভারতীয় বিজ্ঞানীদের স্বপ্নগুলোরও। দেশে
চিপ তৈরির সুযোগ না পেয়ে ভারতের শত শত সেরা সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশলী পাড়ি জমালেন আমেরিকার
সিলিকন ভ্যালি, তাইওয়ান আর ইউরোপে। পরবর্তীতে Intel, AMD, Qualcomm বা NVIDIA-র মতো সংস্থায় যেসব ভারতীয় বিজ্ঞানীরা বিপ্লব ঘটালেন, তারা আসলে হতে পারতেন ভারতের নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর
বিপ্লবের কাণ্ডারী।
চিপ তৈরির স্বপ্ন ভাঙার পর ভারত তার কৌশল বদলে ঝুঁকলো সফটওয়্যার সার্ভিসের দিকে—জন্ম হলো
টিসিএস, ইনফোসিস, উইপ্রোর মতো আইটি জায়ান্টদের। ভারত সফটওয়্যাড়ে বিশ্বজয় করল ঠিকই, কিন্তু
হার্ডওয়্যার বা সেমিকন্ডাক্টরের মতো সবচেয়ে কৌশলগত ক্ষেত্রে চীন ও তাইওয়ানের ওপর চিরতরে
নির্ভরশীল হয়ে পড়ল।
“মহালির সেই রহস্যময় আগুন যদি সেদিন না লাগতো, তবে আজ বিশ্বের চিপ বাজারের মানচিত্রে
তাইওয়ানের পাশাপাশি বিশ্বকে শাসন করতো মেড ইন ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর।“