(কথাবার্তার ভিত্তিতে লেখা। অনুলিখনে সৌম্যা ঘোষ।)

প্রথম পর্ব
একসঙ্গে কাজের সূত্রে নবারুণদা আমার বহু বছরের সঙ্গী। আমার সঙ্গে বয়সের তফাৎ ছিল দশ বছরেরও বেশি। কিন্তু কখনও তাঁকে খুব একটা গম্ভীর বলে মনে হয়নি। যে লেভেলে পড়াশোনা করতেন, যে ধরণের বিষয় নিয়ে কালচার করতেন, তা আজ বিরল। শুধু কবি তো নন, রাজনীতি বা আন্তর্জাতিক দুনিয়া নিয়েও ওঁর গভীর ধারণা ছিল। এবং প্রচুর বিদেশি ছবি দেখতেন, নানা প্রদেশের সাহিত্য পড়তেন… কাজেই, ওঁর পড়াশোনার স্ট্যান্ডার্ড থেকে দেখতে গেলে আমার সঙ্গে ওঁর বন্ধুত্ব হওয়ার কথাই নয়। কিন্তু উনি এমন একজন মানুষ যে সব রকম মানুষদের সঙ্গেই মিশতে পারতেন। আমার কিছু বন্ধু ছিল, যাদের সঙ্গে পড়াশোনার কোনও দূরের সম্পর্কও ছিল না, তারা একেবারেই ছিল ‘রকে’র বন্ধু, — তাদের সঙ্গেও দিব্যি আড্ডা দিতে পারতেন নবারুণদা। ওদেরকে নবারুণদার বাড়িতেও নিয়ে গিয়েছি। অনেকদিন দেখা হয়নি বলে, নবারুণদা’ই নিয়ে যেতে বলেছিলেন। তখন কিন্তু তাদের একবারের জন্যও মনে হয়নি নবারুণদা বড় লেখক বা গম্ভীর প্রকৃতির একজন। বরং, সহজ-সরলই মনে হয়েছিল।
নবারুণদার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। একসঙ্গে কাজ করেছি দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, সোভিয়েত দেশ পত্রিকায়।
নবারুণদার সব বিষয়েই ভীষণরকম আগ্রহ। আমাদের অফিসে প্রতি বছর একবার করে ফুটবল খেলা হত, নবারুণদা একটা দলের ক্যাপ্টেনও ছিলেন। আমি ছবিও তুলেছিলাম।
মনে আছে, চুনি গোস্বামীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন নবারুণদা। নবারুণদাকে লেখক-কবি হিসেবে চেনেন তিনি। মহাশ্বেতা দেবীর ছেলে হিসেবেও জানেন। তো আলাপের পর চুনিদা বলেছিলেন— আপনার তো খেলা নিয়ে অসম্ভব আগ্রহ, ফুটবল নিয়ে দারুণ পড়াশোনা! আপনার প্রশ্ন শুনেই সেটা বুঝতে পারছি।
নবারুণদার ভাষাকে অনেকে ‘অশ্লীল’ বলে। তাতে নবারুণদা কখনও পাত্তা দেননি। বরং স্ল্যাং ব্যবহার করলে মনের ভাব যে অনেক সহজে বোঝানো যায়, তাই তিনি মনে করতেন। যেমন,অপছন্দ হলে নির্দ্বিধায় বলতেন ‘ধুর বাল!’
মনে পড়ে, আমাদের ‘সোভিয়েত দেশ’ অফিসের কথা। বাংলা বিভাগে নবারুণদা কাজ করতেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সিদ্ধেশ্বর সেন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, প্রফুল্ল রায় প্রমুখ।
আমার ফটোগ্রাফি বিভাগ হওয়ায়, অফিসে আমার একটা আলাদা ঘর ছিল। আর, ওদের একটা বিরাট হলঘর ছিল, যেখানে আরও অন্যান্য সাংবাদিকরাও বসতেন। মহাশ্বেতা দেবী মাঝেমাঝে অফিসে আসতেন। একদিন আমি সিগারেট কিনতে যাচ্ছি। গেট থেকে বেরোনোর সময় দেখি তিনি এসেছেন। বললেন— ‘হারামিটা এসেছে?’
হেসে বললাম, হ্যাঁ এসেছে।
বললেন— ‘তুই ফুঁকে ওপরে গেলে ওকে পাঠিয়ে দিস।’
ওপরে গিয়ে নবারুণকে বলতে, বললেন— ‘ও। শালি এসে গেছে!’
মা-ছেলের সম্পর্ক এমনই মজাদার ছিল। ঝগড়া ভালোবাসামাখা এক অপার মায়া…
(চলবে)