
২০১৩ সালে, মৃত্যুর মাত্র এক বছর আগে, নবারুণ ভট্টাচার্য প্রকাশ করেন ‘বেবি কে পারিজাত’। সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই বইটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক রূপক, জনপ্রিয় সংস্কৃতি, বিপ্লবী কল্পনা এবং ধ্বংসের কবিতা। এখানে প্রেম আছে, কিন্তু প্রেমের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে বিদ্রোহ। এখানে বিপ্লব আছে, কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। কেবল রাষ্ট্র, পুঁজিবাদ, কর্তৃত্ব এবং সামাজিক অনুশাসনের বিরুদ্ধে এক ধরনের সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসবাদ – যার ভাষা আগুন, বিস্ফোরণ এবং অরাজকতা।
একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং একজন যৌনকর্মীর প্রেমের গল্প এই উপন্যাসের প্রেক্ষিত। তবে প্রেমের পরিসর পেরিয়ে গল্পটি খুব শীঘ্রই হয়ে ওঠে একটি রাজনৈতিক নৈরাজ্যবাদের ম্যানিফেস্টো। চরিত্র, ঘটনা, সংলাপ – সবকিছুই অতিরঞ্জিত, কার্টুনসুলভ, কখনও হাস্যকর, কখনও দুঃস্বপ্নের মতো। এই জাদুবাস্তবতায় বারবার ফিরে আসে আগুন, পেট্রোল এবং আগ্নেয়াস্ত্র। সেই আগুনই যেন প্রান্তিক মানুষের ক্ষোভের প্রতিনিধি। এই অতিরঞ্জনই উপন্যাসের মূল বৈশিষ্ট্য, কারণ নবারুণের কাছে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং রাষ্ট্রের সহিংসতাও সমানভাবে উদ্ভট ও অবাস্তব।
আগুন নবারুণ ভট্টাচার্যের সাহিত্যে একটি রাজনৈতিক প্রতীক বা নৈতিক প্রতিক্রিয়া। যে পৃথিবী পচে গেছে, যে সমাজ নিজের অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দিতে শিখেছে, যে রাষ্ট্র প্রতিদিন মানুষের কল্পনাশক্তিকে হত্যা করে, তার বিরুদ্ধে নবারুণের চরিত্ররা প্রায়শই আগুনকেই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নেয়। ‘বেবি-কে পারিজাত’ সেই আগুনেরই একটি উজ্জ্বল প্রতিরূপ। এখানে আগুন প্রত্যাখ্যান এবং পুনর্জন্মেরও প্রতীক। রাষ্ট্র, কর্পোরেট পুঁজিবাদ এবং মধ্যবিত্ত নৈতিকতার যে কৃত্রিম স্থিতাবস্থা, আগুন সেই স্থিতাবস্থাকে ভস্মীভূত করে। এই আগুন মার্কসবাদী বিপ্লবের ঐতিহ্যবাহী “পুরোনো সমাজ ধ্বংস করে নতুন সমাজ গড়া” ধারণার সঙ্গে যুক্ত হলেও, এর মধ্যে একটি নৈরাজ্যবাদী তাগিদও আছে। যেন প্রথম কাজ হলো সমস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংসদ, অফিস এবং মতাদর্শের মূর্তি পুড়িয়ে ফেলা, তারপর দেখা যাবে কী জন্ম নেয়।
মনে পড়ে যায় জেমস ম্যাকটিগের ‘ভি ফর ভেনডাটার’ ধ্বংসাত্মক উল্লাস। যেমন ভি একটি মুখোশধারী রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়, তেমনি বেবি-কে’ও যেন বাস্তব মানুষের ঊর্ধ্বে এক ধরনের বিদ্রোহী কল্পচরিত্র। টারান্টিনোর চলচ্চিত্রের মতো এখানেও সহিংসতা রসিক এবং প্রায়শই উদ্ভট। তবে টারান্টিনোর সহিংসতা যেখানে নান্দনিক, নবারুণের সহিংসতা সেখানে রাজনৈতিক। যেন তাকাশি মিকে অথবা কিম কি-দুকের হিংস্রতা এসে মিলেছে কলকাতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভূগোলে।
তা সত্ত্বেও এটি নবারুণের সম্পূর্ণ নিজস্ব জগৎ, যেখানে বিপ্লব জন্ম নেয় ধ্বংসস্তূপে, উন্মাদদের স্বপ্নে, এবং প্রান্তিক মানুষের কল্পনায়। হারবার্টের ব্যর্থ বিপ্লবী স্বপ্ন, অথবা ‘কাঙাল মালসাট’-এর প্রান্তিক মানুষের বিপ্লব, বা লুব্ধকের ধ্বংসাত্মক ডিস্টোপিয়া, সবেরই প্রতিধ্বনি যেন এখানে শোনা যায়। তবে ‘কাঙাল মালসাট’-এর মতো এখানে কোনো প্রতিবাদের উচ্ছ্বাস নেই। কাঙাল মালসাট’-এ ফ্যাতাড়ু ও চোক্তারদের মাধ্যমে কলকাতার শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে এক উল্লাসধর্মী বিদ্রোহ দেখা যায়। ‘বেবি-কে পারিজাত’-এ প্রতিবাদের ভাষা যেন সমস্ত প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বিরুদ্ধে একটা অস্তিত্বগত বিদ্রোহ, যা ব্যক্ত হয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতাকে অপমান করা। ‘বেবি কে’র চরিত্রদের কাছে বিদ্যমান বাস্তবতাই অসহ্য। আগুন, বিস্ফোরণ, ধ্বংস আর প্রত্যাখ্যানের মধ্যেই তারা খুঁজে ফেরে মুক্তির সম্ভাবনা। ফলত বইটি নবারুণের রাজনৈতিক কল্পনার শেষ পর্যায়ের দলিল বলেও পড়া যায়, যেখানে মার্কসবাদী সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা ক্রমশ অ্যানার্কিস্ট প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে মিশে যায়।
এই নৈরাজ্যবাদ ও সাম্যবাদের সংমিশ্রণ নবারুণের রাজনৈতিক কল্পনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্র-সমর্থিত বামপন্থাকে তিনি সন্দেহের চোখে দেখেন, তাঁর সহানুভূতি সবসময় থাকে পরাজিত, ভবঘুরে, পাগল, ভবিষ্যতহীন মানুষের দিকে। ফলে ‘বেবি কে পারিজাত’-এর বিপ্লবও যেন রাস্তার, গলির, ধ্বংসস্তূপের বিপ্লব।
‘বেবি কে পারিজাত’ একটি বিপ্লবী ফ্যান্টাসি, কিন্তু সেই ফ্যান্টাসি কোনো ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখায় না। বরং এটি ধ্বংসের সৌন্দর্য, আগুনের রাজনীতি এবং অস্বীকৃতির নৈতিকতা নিয়ে কাজ করে। নবারুণ যেন বলতে চান – পৃথিবী এতটাই পচে গিয়েছে যে তাকে সংস্কার করা যায় না, তাকে প্রথমে জ্বালিয়ে দিতে হবে। সেই আগুনের শিখাতেই হয়তো ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। এই কারণেই ‘বেবি কে পারিজাত’ বাংলা সাহিত্যে এক ধরনের অগ্নিলিপি, যেখানে বিদ্রোহ কবিতার রূপ নেয়, আর ধ্বংস নিজেই হয়ে ওঠে এক সৃজনশীল, মুক্তিকামী শক্তি। বইটি পড়ে পাঠক জানেন না এরপর কী হবে, কোনো নতুন পৃথিবী আদৌ জন্ম নেবে কি না, কিংবা ধ্বংসের পর আদৌ কিছু অবশিষ্ট থাকবে কি না। নবারুণ সেই উত্তর দিতে আগ্রহী নন। তিনি আমাদের এমন এক মুহূর্তে দাঁড় করিয়ে দেন, যেখানে পুরোনো পৃথিবীর বৈধতা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, কিন্তু নতুন পৃথিবীর রূপরেখা এখনও অদৃশ্য। নবারুণের রাজনৈতিক চেতনা যেন এই অনিশ্চয়তায় শক্তি খুঁজে পায়। নবারুণের কাছে বিপ্লব কোনো গন্তব্য নয়, কেবল ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক অন্তহীন লড়াই। আগুন তাই এখানে কল্পনারও প্রতীক, যে কল্পনা বর্তমানকে মেনে নিতে অস্বীকার করে।
কবি এবং অধ্যাপক অর্পণ চক্রবর্তী জানালেন, নবারুণের লেখায় যেই আগুন বারবার জ্বলে ওঠে, তা কেবল কোনো তাত্ত্বিক রূপক বা সচেতনভাবে চাপিয়ে দেওয়া প্রতীক নয়। বরং তা তাঁর যাপিত জীবন, রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং সমাজ বাস্তবতার বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশ। নবারুণ বুর্জোয়া ভণ্ডামির বিরুদ্ধে যে তীব্র ক্ষোভ বুকে পুষে রাখতেন, তারই এক সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত রূপ হলো এই আগুন। নবারুণের লেখা তাঁর ব্যক্তিজীবনের সততা ও আপসহীনতা থেকে প্রোথিত এক স্বাভাবিক প্রতিরোধ।
সপ্তর্ষি প্রকাশনের কর্ণধার সৌরভ মুখোপাধ্যায় ট্রামলাইনকে জানালেন, ২০১২ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ এক বিকেলে লেখকের বাড়িতে আড্ডার সময় এই বইটির পরিকল্পনা করা হয়। সপ্তর্ষির নিজস্ব পাঠকবলয় থেকে দীর্ঘদিন ধরেই একটি নতুন ফ্যাতাড়ু সিরিজের দাবি ছিল। সেই আড্ডায় নবারুণ বাবু প্রতিশ্রুতি দেন এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের কলকাতা বইমেলায় বইটি প্রকাশ করা হয়। সৌরভবাবুর মতে, বইটি সম্পূর্ণ ফ্যাতাড়ু-কেন্দ্রিক না হলেও ছিল একটি ফ্যাতাড়ুদের ভবিষ্যতের আভাস দেয়। সৌরভবাবু আরও জানালেন, বর্তমানে এই বইটির চাহিদা ও প্রাসঙ্গিকতা ক্রমশ বাড়ছে। প্রখ্যাত পরিচালক রঙ্গন চক্রবর্তীও এটি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করেছিলেন।
নবারুণের মৃত্যুর কিছুদিন আগে প্রকাশিত এই গ্রন্থটিকে তাঁর সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক যাত্রাপথের এক অন্তিম বিবৃতি বলে মনে করা যায়। ‘হারবার্ট’-এর ভূত, ‘কাঙাল মালসাট’-এর ফ্যাতাড়ু, ‘ লুব্ধক’-এর ধ্বংসস্তূপ, সবকিছু যেন এসে মিলিত হয়েছে ‘বেবি-কে পারিজাত’-এর আগুনে। সেই আগুন কোনো সমাধান বা সান্ত্বনা নেই। কেবল আছে প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে অস্বীকার, যা বিপ্লবের প্রথম সাক্ষর।