
গড়িয়াহাট মার্কেটের মোড়ের চায়ের দোকানে আজ সকাল থেকেই বিশ্বকাপের বিশেষ অধিবেশন। একদিকে ফুলকপি, পটল আর ইলিশের বাজার, অন্যদিকে ফুটবল-বিশেষজ্ঞ জ্যেঠু-কাকুদের সংসদ।
“বলো দেখি, মেসি কী খেয়ে খেলতে নামছে?”—প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন সমরকাকু। “কমপ্লান না হরলিক্স? এই বয়সে হ্যাটট্রিক করলে তো কিছু একটা গোপন রহস্য আছেই!”
পাশ থেকে নিত্যানন্দ জ্যেঠু গম্ভীর মুখে বললেন, “ধুর! ওসব নয়। ছোটবেলা থেকে ডাল-ভাত খেলে তবেই এই স্ট্যামিনা আসে!”
চায়ের দোকানের মালিক ফিসফিস করে যোগ করলেন, “দাদা, ডাল-ভাত হলে আমিও ব্যালন ডি’অর পেতাম!”
এদিকে প্রথম ম্যাচে ড্র করার পর ব্রাজিল ছন্দে ফিরতেই ভিনি জুনিয়রকে নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এবার প্রথম ম্যাচে ফ্লপ। নেইমার এখনও নেই। সোনার বুটের দাবিদার তাহলে কে হবে?
“ভিনি ভালো খেলছে ঠিকই,” বললেন প্রবীর জ্যেঠু, “কিন্তু ও কি নেইমার, রোনালদো, রোমারিওদের জাতের?”
অন্য প্রান্ত থেকে প্রতিবাদ, “আপনারা আবার সবকিছুর সঙ্গে নস্টালজিয়া মেশান! পেলের পর সবাই খারাপ, মারাদোনার পর সবাই সাধারণ—এভাবে হবে?”
হ্যারি কেনের নাম উঠতেই আরেক দফা তর্ক। “ইপিএলের ফর্ম বিশ্বকাপেও ধরে রেখেছে লোকটা,” মন্তব্য করলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ককর্মী অরুণবাবু।

“হুঁঃ! ইংল্যান্ডকে নিয়ে বেশি উত্তেজিত হবেন না,” জবাব এল। “কোয়ার্টার ফাইনাল এলেই এদের শরীরে রহস্যময় ভাইরাস ঢুকে যায়!”
মিডিয়ার রিপোর্টে বিশ্লেষণ চলছে—ব্রাজিল কি সত্যিই ছন্দে ফিরেছে? ভিনি কি নতুন কিংবদন্তি? হ্যারি কেন কি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে? কিন্তু গড়িয়াহাটের চায়ের দোকানে বিশ্লেষণের মান আরও উন্নত।
হঠাৎ প্রবীর জ্যেঠু প্রশ্ন তুললেন, “এই যে জলের ব্রেক দেয়, আদৌ প্রয়োজন আছে?”
পাশ থেকে উত্তর এল, “অবশ্যই আছে! আমাদের সময় অফিসে ফ্যান চলত না, তাই বলে ফুটবলারদেরও কষ্ট পেতে হবে নাকি?”

আরেকজন বললেন, “আমি তো ভাবছিলাম জলের ব্রেকে ওরা লেবু চা খায়!” পাশ থেকে টিপ্পনি এলো, “হাজমোলা দিয়ে!”
তর্ক, হাসি আর চায়ের ভাঁড়ের ধোঁয়ার মধ্যে শেষ পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো গেল না। শুধু এটুকু ঠিক হলো—মেসি কমপ্লান খেলেও নায়ক, হরলিক্স খেলেও নায়ক; ভিনি এখনও পরীক্ষার খাতায়; আর হ্যারি কেনকে নিয়ে আশা করতে দোষ নেই, তবে খুব বেশি আশাও বিপজ্জনক।
বিশ্বকাপ আসলে শুধু ফুটবল নয়। এটা বাঙালি মধ্যবিত্তের দ্বিতীয় দুর্গাপুজো—যেখানে সবাই কোচ, সবাই নির্বাচক, সবাই ধারাভাষ্যকার; আর শেষ সত্যিটা একটাই—চায়ের দোকানের আড্ডা ছাড়া বিশ্বকাপের মজা অর্ধেক হয়ে যায়।