লেখক-সাংবাদিক-অভিনেতা অনির্বান ভট্টাচার্যের সঙ্গে কথপোকথনে ট্রামলাইন।

বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে জাতিস্বত্বা নিয়ে অরূপরতন চক্রবর্তীর সঙ্গে একান্ত ঘরোয়া আলোচনায় উঠে এলো বাঙালির ফুটবল প্রীতি।
ট্রামলাইন: স্কুল থেকে ফেরার পর খেলা হত কতটা? ফুটবল না ক্রিকেট- কোনটা পছন্দের ছিল?
অনির্বান ভট্টাচার্য: আমিই ফুটবল, ক্রিকেট, দুটোই খেলতাম। ক্রিকেটে লেগস্পিন করতাম। ফুটবলে গোলকিপিং। ‘৯০-এর বিশ্বকাপে পেনাল্টি বাঁচিয়ে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন গায়কোচিয়া। দলের নিয়মিত গোলকিপার চোট পাওয়ায় তিনি খেলার সুযোগ পান। আমরা তার খেলা দেখে পাগল হয়ে গেছিলাম। গোলকিপার হয়ে খেলে পেনাল্টি বাঁচাবো, এটাই বিশাল ব্যাপার মনে হতো।
ট্রামলাইন: বিশ্বকাপের সঙ্গে পরিচিতি কবে থেকে, ‘৯০ থেকেই ?
অনির্বান ভট্টাচার্য: না, না, ১৯৮৬ থেকে বিশ্বকাপ দেখছি। তখন আমি খুব ছোট কিন্তু মনে আছে ওটা। মেক্সিকো বিশ্বকাপ। তখন আমরা ওডিশার বড়বিল বলে একটি মাইনিং টাউনে থাকতাম। সেই প্রথম শাটার দেওয়া টিভি এলো আমাদের বাড়িতে। লম্বা এন্টেনা, যাতে কাক বসলে ঘুরে যেত, ছবি নড়ে যেত। তখন গভীররাতে খেলা। সবার বাড়িতে তখন টিভি ছিলোও না। যাদের বাড়িতে টিভি থাকতো, সেখানেই জমায়েত হতো। খেলা মাঝরাতে, আমার স্কুল সকাল ৭টা থেকে। ঘোমটা যেতেই হবে। জোর করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতাম। পাশের ঘরে খেলা দেখা নিয়ে হৈহুল্লোড় হচ্ছে। বাবা এবং কিছু আত্মীয়রা আছেন। মা ট্রেতে করে কমলা রঙের রসনার শরবত নিয়ে আসছেন ফ্রিজ থেকে। তিনিও বসে দেখবেন। তবে ৮৬’র বিশ্বকাপে ঈশ্বরদর্শন হলো। মারাদোনাই ধর্ম হয়ে গেলো। সেখান থেকে আর বেরোতে পারিনি আজও। তখন অত নিয়ম বুঝতামও না। টিভির পর্দায় আশ্চর্য্য হয়ে দেখতাম, একটা লোক ওরকম ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এবং কেউ তাকে ধরতে পারছে না। হাত নেড়ে দর্শকদের চাগাচ্ছে।

ট্রামলাইন: ব্রাজিল না আজেন্টিনা? নাকি জার্মানি?
অনির্বান ভট্টাচার্য: আমি আজেন্টিনা এবং মারাদোনা। মেসি আমার খুব একটা পছন্দের নয়। মেসি নিঃসন্দেহে অনবদ্য। কিন্তু আমি মেসির সাপোর্টার নোই, আমি আর্জেন্টিনার সাপোর্টার।
ট্রামলাইন: রাত জেগে খেলা দেখাটা কি একা নাকি বন্ধুবান্ধব, পরিবার পরিজন মিলে?
অনির্বান ভট্টাচার্য: এখন একাই খেলা দেখতে হয়। ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকলে হৈ-হল্লা, চিলচিৎকার করে অন্যদের অসুবিধে করে খেলা দেখা যায় না। এক এক খেলা দক্ষতায় একটি মনখারাপের বটেই। বাবাকে বড় মিস করি। তিনি আমাকে খেলা দেখানো শিখিয়েছিলেন। খেলা দেখতে গিয়ে পরিবারের কেউ একজন টিভির সামনে এগিয়ে গিয়ে বলে উঠলো, ফাঁকা দেখে এগিয়ে যা না – অথবা কেউ পাস মিস করলে গালাগাল। এগুলো মনে পড়লে এখন হাঁসি পায় কিন্তু ওই ইমোশন রিলিভ না করতে পারাটা বড় কষ্টও দেয়।
ট্রামলাইন: বিশ্বকাপ ফুটবল কিভাবে জাতিসত্বা তুলে ধরে বলে মনে করেন ?
অনির্বান ভট্টাচার্য: আমি ফুটবলে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকগুলো নিয়ে কাজ এবং পড়াশোনা করা চেষ্টা করি। খেলাধুলো এবং রাজনীতির কোনও যোগাযোগ নেই – এর চেয়ে বোকার মত কথাবার্তা আর হয়না। এটা চিরকাল ছিল, চিরকাল থেকেছে, এবার কে কীভাবে ডিসাইফার করবে, সেটা তাদের ব্যাপার। ‘৭৮-এ যখন বিশ্বকাপ হচ্ছে, আর্জেন্টিনা জিতছে, সেখানকার একনায়ক বা জুন্টা সরকার সেই জয়কে কেন্দ্র করে কীভাবে ম্যানুপুলেট করছে, সে নিয়ে আজও লেখা হয়। ১৯৯০ সালে Dinamo Zagreb–Red Star Belgrade ম্যাচে দাঙ্গার সময় অধিনায়ক জনিমির বোবান ডায়নামো সমর্থকদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। ভবনের পুলিশকে লাথি মারার ঘটনাটি ক্রোয়েশীয় জাতীয়তাবাদের প্রতীকে পরিণত হয়ে যোগোস্লাভিয়ার টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যাওয়ার অন্যতম ক্যাটালিস্ট হয়ে দাঁড়ায়। আরব স্প্রিং – জাতীয়তাবাদের সঙ্গেও মিশরে ফুটবলের যোগাযোগ আছে। ফুটবল এতটাই একটা ভোলাটাইল এবং ডাইনামিক খেলা, যে স্টেডিয়ামের ভেতর এবং স্টেডিয়ামের বাইরে থেকে জাতিস্বত্তার উন্মেষ হয় এবং হয়ে আসছে।

এবার ইরানের খেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলা হয়েছে মেক্সিকোর বেসে ফিরে যেতে। তো, ইটা কি ইরানকে পরে ম্যাচে আরও উদ্বুদ্ধ করবে না? আলবাত করবে। ফিফা যে হাইতির জার্সি চেঞ্জ করালো, তার পলিটিকাল কোনোটেশন, তা নিয়ে খুব কম কথা হলেও, ইতিহাসে তা থেকে যাবে। ফুটবল বা যেকোনও খলাজটির গড়ে ওঠার পেছনে একটি শক্তি।
ট্রামলাইন: এই বিশ্বকাপে কি হতে চলেছে বলে মনে হচ্ছে?
অনির্বান ভট্টাচার্য: ৪৮টা দেশের খেলা। সব দেখা সম্ভব নয়। এ টা তো বিশ্বকাপ। কোন খেলা, কোন দলের মধ্যে কেমন হতে পারে। কে ভেবেছিলো, স্পেনকে অভাবে আটকে দেবে? কোয়ার্টারফাইনালের থেকেই যে দুরন্ত খেলা হবে কোনও গ্যারান্টি নেই। বদলে বোরিং খেলা হতেই পারে। যতটা পারি প্ল্যান করে যতটা বেশি খেলা দেখবো। বড় তিমি -ওইসব বিশ্বকাপে ম্যাটার করে না। ম্যাটার করে স্পিরিট। আমার কাছে ফাইনাল নয়, ফাইনালের কাছাকাছি ইম্পর্ট্যান্ট প্রত্যেকটা ম্যাচ।