একটা আশ্চর্য মিল!
একটা অমোঘ কাকতালীয় সংযোগও বলা যায়..
সালটা ১৯৫৫। সে বছর অগস্ট মাসে মুক্তি পেল সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’। আর একই মাসে নৃত্যশিল্পের কিংবদন্তী উদয় শঙ্কর ও তাঁর সহধর্মিণী অমলা শঙ্করের কোল আলো করে ভূমিষ্ঠ হলেন মমতা শঙ্কর। এই ভাবেই এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়ালেন সত্যজিৎ রায় ও মমতা শঙ্কর। একই বছরে দু’জন দু’ভাবে জন্ম নিয়ে…
মমতার রবুকাকার (পণ্ডিত রবিশঙ্কর) সঙ্গীত পরিচালনায় ‘পথের পাঁচালী’র মায়াময় তারসানাইয়ের সুর ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সাংগীতিক মূর্ছনার আবহ। মমতার অভিনয় ইচ্ছের সঙ্গে কি ‘পথের পাঁচালী’র সেই অলৌকিক সুরের কোনও যোগ ছিল? সেও তো এক রক্তের সংযোগ!
শঙ্কর বাড়ির পরিবেশে সিনেমার বাতাস বহুদিন ধরেই বহমান। ১৯৪৮ সালে মমতার বাবা উদয় শঙ্করের পরিচালনায় ‘কল্পনা’ ছবিটি আত্মপ্রকাশ করে শুধু যে রসিক দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিল তা নয়, পরিচালক সত্যজিৎ বারবার নানা অনুষ্ঠানে ওই ছবি দেখতে চলে যেতেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। বলা যায়, কল্পনার ফ্রেম বাই ফ্রেম তাঁর মুখস্থ ছিল।
সেই সময় দক্ষিণ কলকাতার গলফ ক্লাব রোডে ফিল্ম সার্ভিস নামের এক বাড়ির একতলায় ছিল ল্যাবরেটারি রুম। সেখানে সিনেমা তৈরির যাবতীয় প্রযুক্তিগত কাজ হত। সেখানে ছিল প্রজেকশন রুম-ও। দোতলায় সপরিবারে থাকতেন উদয় শঙ্কর। ফিল্ম সার্ভিসে কোনও নিজস্ব কাজে এলে সত্যজিৎ একবার তাঁর সঙ্গে দোতালায় দেখা করে আসতেন। সেখানেই মমতা তাঁর ছোটবেলায় সত্যজিৎ রায়কে দেখেন প্রথম।
আশৈশব এই পরিচয়ের ফলে মমতার প্রথম ছবি হতেই পারত সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে। কিন্তু ঘটনা ঘটল উল্টো। মমতা প্রথম নায়িকা হলেন মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’র। সেটা ১৯৭৬ সাল। তারপর বহু দিকপাল পরিচালকের সঙ্গে অভিনয় করলেন। অবশেষে ১৯৮৭ সালে সত্যজিতের ছবির নায়িকা হয়ে এলেন ‘গণশত্রু’ ছবিতে।
সত্যজিতের মমতার প্রতিভাকে স্বাগত জানাতে এত দেরি হল কেন, সে প্রশ্নের উত্তর অজানা। অভিনয় জগতে আসার পর বিভিন্ন জমায়েতে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে। এবং তিনি মমতাকে এমনও বলেছেন যে ‘অমুক ছবিটা দেখলাম। (ছবির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মমতা) তোমার জন্য ছবিটা বেঁচে গেছে। তুমিই ছবিটাকে বাঁচিয়ে দিয়েছো।’
সাতের দশকে মৃণাল সেনের ছবিতে মমতার অভিনেত্রী জীবন যদি দক্ষতার এক শৃঙ্গ ছুঁয়ে থাকে, তা হলে আটের দশকে সে জীবন অন্য আরেক শৃঙ্গে পৌঁছয় সত্যজিতের ‘গণশত্রু’ ছবিতে। সালটা ১৯৮৬। এরপরের ছবি ‘শাখা প্রশাখা’ ১৯৯০ সালে। এবং সত্যজিতের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’ (১৯৯১)-র নায়িকা কিন্তু মমতাই।
স্মৃতির সরণিতে ভেসে যেতে যেতে মমতা বলছিলেন, ‘চিড়িয়াখানা’ ছবির শুটিং হয় যখন, মানিককাকা তখন বাবাকে ডেকেছিলেন শুটিং দেখতে। সঙ্গে আমি আর আমার এক দাদাও ছিল।’ বাবার সঙ্গে গিয়ে সেখানে সত্যজিৎ রায়কে কর্মরত অবস্থায় সেই প্রথম দেখেন ছোট্ট মমতা।
‘ঘরে বাইরে’ করার পাঁচ বছর পর সত্যজিৎ কোনও পূর্ণদৈর্ঘ্যর ছবি করেননি। হঠাৎ এক দিন সকালে মমতার স্বামী চন্দ্রোদয় ঘোষ কাগজে দেখেন যে সত্যজিৎ রায় আবার ছবি করছেন। সে কথা তিনি ঘুমন্ত মমতাকে জানান তখনই। আধো ঘুমে আধো জাগরণে মমতা বলেছিলেন ‘ইশশ আমায় যদি নিতেন!’ কিন্তু এই বলেই আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন…খানিক পরেই চন্দ্রোদয় সত্যজিতের ফোন নম্বর জোগাড় করেন ও ডায়াল করে ঘুমন্ত মমতাকে জাগিয়ে কানে ফোনটা ধরিয়ে দেন। মমতা শোনেন ফোনে রিং হচ্ছে। তিনি চন্দ্রোদয়কে জিজ্ঞেস করেন ‘কাকে ফোনে করেছো?’ চন্দ্রোদয় বলেন, ‘সত্যজিৎ রায়কে!’
শুনে মমতার ঘুমটুম উড়ে যায় রাতারাতি। রিসিভারটা ধরে তোতলাতে তোতলাতে বলেন, ‘আমি মমতা শঙ্কর’। অন্য প্রান্তে গম্ভীর স্বর বলেন, ‘হ্যাঁ, বলো কি খবর?’ মমতা বলেন, ‘কাগজে দেখলাম আপনি আবার ছবি করছেন। কোনও ছোট রোলেও যদি আপনি আমাকে সুযোগ দেন…’। সত্যজিতের উত্তর, ‘আমি যে তোমার কথা একেবারে ভাবিনি, তা কিন্তু নয়’..
ক্রমে মমতা তাঁর ‘মানিককাকা’র কাছে ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ হয়ে গেলেন। মমতা বলেছিলেন, ‘এ তো মেঘ না চাইতেই জল’…কারণ সত্যজিৎ জানালেন দুটো ছবি করার কথা তাঁর। কিন্তু যেটাই তিনি করুন না কেন মমতাকে নেবেনই…
হেনরিক ইবসেনের নাটক ‘অ্যান এনিমি অফ দ্য পিপল’ অবলম্বনে ‘গণশত্রু’ ছবিতে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের চোখে সামাজিক ভাবে বিপর্যস্ত এক চিকিৎসকের (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) মান-সম্মান হারিয়ে, পায়ের তলা থেকে মাটি যখন সরে যায়, তখন তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায় তাঁর কন্যা রানু। এই রানু চরিত্রতেই কাজ করতে পেরে আনন্দিত হয়েছিলেন মমতা। বললেন, ‘আমার মধ্যেও এক ধরনের বলিষ্ঠতা আছে, যার জন্য আমার রানুকে নিজের প্রতিবিম্ব ভাবতে সুবিধেই হয়েছিল।’
‘গণশত্রু’র পর ‘শাখাপ্রশাখা’য় দীপঙ্কর দে-র স্ত্রী ও রঞ্জিত মল্লিকের বৌদি তপতীর চরিত্রে অভিনয় করে একটা আশ্চর্য আলো খুঁজে পেয়েছিলেন মমতা। বললেন, ‘তপতীর মধ্যে তাঁর বহির্মুখি স্বামী ও দেওরের (রঞ্জিত মল্লিক) সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে টানাপড়েন থাকলেও তাঁর দৃপ্ততাও আছে।’ এরপর
মমতার সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের শৈল্পিক আদানপ্রদান ক্রমশ বেড়া ভেঙে এগোয়। আর সে বেড়া ভাঙেন সত্যজিৎ নিজেই। মমতা জানান, ‘শাখা প্রশাখা’য় একটা সংলাপ ছিল, রঞ্জিত মল্লিক ওরফে প্রতাপের তাঁর বউদি তপতী বা মমতার উদ্দেশ্যে। প্রতাপ বলেন, ‘স্ত্রী বন্ধু হলে কি বউদির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় না?’ এই দৃশ্যে তপতীর উত্তর ছিল ‘থ্রি ইজ আ ক্রাউড প্রতাপ!’
প্রথম শুটিং এই সংলাপ সমেতই হয়েছিল।
কিন্তু রাশ প্রিন্ট দেখে সত্যজিৎ জানালেন নেগেটিভে কি সব গোলমাল আছে, আবার শুটিং করতে হবে। মমতা সত্যজিতের কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন। সত্যজিৎ পাশের চেয়ারটা কাছে টেনে এনে বললেন ‘বোস’। সত্যজিতের পাশের চেয়ারে বসতে সংকোচ হওয়ায় মমতা চেয়ারটিকে একটু পেছনে টেনে নিয়ে বসলেন। সত্যজিৎ পাইপটাকে দাঁত দিয়ে কামড়াতে কামড়াতে বললেন, ‘থ্রি ইজ আ ক্রাউড’ কথাটা মফস্বলের লোকে বুঝতে পারবে না। তুই এর জায়গায় অন্য একটা কিছু ভাব তো।’ সত্যজিতের এই আদেশে একেবারে বাকরুদ্ধ মমতা! বললেন, ‘আমি তো অবাক! আমাকে জিজ্ঞেস করছেন বিকল্প সংলাপের কথা! না আছে আমার ভাষাজ্ঞান, না আছে পাণ্ডিত্য!’
এরপর মমতার কাছে বহু পরিচালক এসেছেন ও বলেছেন তাঁরা চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য ছবি করতে চান। বা, পুরস্কারের জন্য। কিন্তু সাধারণ মানুষ সে ছবি দেখবেন কি না তা নিয়ে মাথাই ঘামান না তাঁরা। আর সত্যজিৎ, যিনি নিশ্চিত জানেন সাধারণ মানুষ দেখুক কি বা না দেখুক তাঁর ছবি চলচ্চিত্র উৎসবে যাবেই, সেই তিনি কি না ভাবছেন মফস্বলের মানুষের কথা? তাই
মমতার সেই মুহূর্তেই মনে হয়েছিল, ‘এই ভাবধারার কারণেই উনি সত্যজিৎ রায়!’
মমতা বলেছিলেন ‘মানিককাকা, যদি বলি ‘ও সব কথা থাক প্রতাপ’, তাতে সত্যজিৎ বললেন ‘বাহ খুব ভাল। এটাই বল’।
‘শাখাপ্রশাখা’ ছবিতে মমতার এই সংলাপটিই কিন্তু রাখা হয়…
তবে সত্যজিৎ রায়ের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-র অনিলা সবচেয়ে সমাদরের চরিত্র মমতার কাছে। কিংবদন্তী পরিচালকের শেষ ছবির নায়িকা তিনিই। আর কেউ নন। এই ছবি করার আগে মমতা এবং তাঁর নাচের দল বিদেশে ছিলেন। তাই যখন তিনি জানান, ঠিক শুটিঙের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরতে পারবেন না, কারণ বিদেশের সমস্ত অনুষ্ঠানের জন্য তিনি এক বছর আগে থেকেই অঙ্গীকারবদ্ধ। তাতে সত্যজিৎ বলেন ‘তুই যদি এই ছবিতে অভিনয় না করিস, তা হলে আমি ছবিটাই করব না।’
মমতা হতবাক হয়ে যান। এবং ভাবেন যাঁর ছবিতে অভিনয় করার জন্য সারা পৃথিবীর অভিনেত্রীরা উদ্গ্রীব হয়ে থাকেন, তিনি এই কথা বলছেন!
শেষমেশ ছবিটি হল।
মমতা জানান, ‘আগন্তুক’ এ প্রত্যেকটি চরিত্রের সঙ্গে প্রত্যেকের সম্পর্কের মধ্যেই আছে অসম্ভব যাদুর স্পর্শ। মানে ম্যাজিক। ছবিতে সাঁওতাল মেয়েদের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে শান্তিনিকেতনের প্রত্যন্ত এক পল্লীপ্রান্তরে অনিলা যখন নেচে ওঠে, তখন আগন্তুক মামাবাবু ( উৎপল দত্ত) উপলব্ধি করেন এই অনিলা সত্যিই তাঁর ভাগ্নি হওয়ার যোগ্য। এবং তখন উৎপল দত্ত বলেন, ‘ও আমার ভাগ্নি কি না সে বিষয়ে সন্দেহ ছিল, এখন আর নেই।’
মমতার বক্তব্য, চিত্রনাট্য পড়ার সময় সত্যজিৎ এমন ভাবে সংলাপটি বলেছিলেন, যা এখনও মনে আর চোখে লেগে আছে তাঁর। এমনটা আর হয় না।
‘আগন্তুক’ ছবির ওই সাঁওতাল কন্যাদের সঙ্গে নাচ কোনও অনিবার্য কারণে ময়দানে দ্বিতীয়বার রিশুট করা হয়েছিল। শুটিঙের পর একটা চেক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ। ‘কিসের চেক?’ প্রশ্ন করায় সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘এটা একটা এক্সট্রা দিন কাজ করানোর জন্য। এটা তোর প্রাপ্য।’
অবশ্য শুধু সত্যজিৎ কেন? ‘একদিন প্রতিদিন’ হিট হওয়ার পর মৃণাল সেনও আরেকটি চেক পাঠিয়েছিলেন মমতাকে। এই সব কথা বলতে বলতে শূন্য হয় মমতার দৃষ্টি। আপনমনেই বলেন, ‘মানিককাকা, মৃণালদারা চলে গিয়ে মনে হয় ওপরটা অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে বহুদিন…
মৃণাল সেনকে মমতা পেয়েছেন অভিনয় জীবনের একেবারে শুরুতে। কিন্তু সত্যজিৎ এলেন তাঁর নিজের জীবনের অন্তিম লগ্নে। যে তারুণ্যে মমতা মৃণালের সঙ্গে কাজ করেছেন, সেই স্নিগ্ধ আর উদ্বেল তারুণ্য পেরিয়ে মমতা পেয়েছিলেন মানিককাকাকে।
এর জন্য কোনও আক্ষেপ আছে কি? মমতার সাফ জবাব, না, মনে কোনও আক্ষেপ বা দ্বন্দ্ব বা আফসোস নেই। প্রত্যেকটা সুযোগের একটা সময় আছে। সময় না এলে সে কাজ হয় না। ‘যা এতদিন পেয়েছি তা সত্য সাঁই বাবার কৃপায় পেয়েছি। যা পাইনি তা প্রাপ্য নয় বলে পাইনি। বা পাওয়ার সময় এখনও আসেনি’, চূড়ান্ত ঈশ্বর বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে বললেন মমতা।




No Comment! Be the first one.