ইনস্টাগ্রাম: ভারতের নতুন জনমঞ্চ — প্রতিবাদের ভাষা বদলে দিচ্ছে GEN-Z
অরূপরতন চক্রবর্তী

এক সময় রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার ছিল সভা, মিছিল, পোস্টার এবং টেলিভিশনের পর্দা। তারপর এলো ফেসবুক ও টুইটার (বর্তমান X)-এর যুগ।
কিন্তু ২০২৬ সালের ভারতীয় রাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে— জেন-জি প্রজন্মের কাছে ইনস্টাগ্রাম এখন শুধু ছবি বা রিলসের অ্যাপ নয়; এটি প্রতিবাদ, সংগঠন এবং জনমত গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন এবং তার পরবর্তী বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক প্রচারাভিযান সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ককরোচ জনতা পার্টি: এক ডিজিটাল বিস্ফোরণ
ককরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janta Party বা CJP)-এর উত্থান এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। অভিজিৎ দীপকের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই ব্যঙ্গাত্মক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, বেকারত্ব এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংকটকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনের মধ্যেই কোটি কোটি তরুণের সমর্থন অর্জন করে। ইনস্টাগ্রামে তাদের অনুসারীর সংখ্যা কয়েক দিনের মধ্যেই ১.৪ কোটিরও বেশি হয়ে যায়, যা দেশের বহু প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের ডিজিটাল উপস্থিতিকেও ছাড়িয়ে যায়।
এই আন্দোলনের সাফল্য শুধু অনুসারীর সংখ্যায় সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে চলা ছাত্র বিক্ষোভের পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। যদিও পদত্যাগের পেছনে নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণ ছিল, তবু আন্দোলনের ডিজিটাল চাপ এবং রাস্তায় নেমে আসা ছাত্রদের ঐক্য যে এই ঘটনাকে ত্বরান্বিত করেছে, তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
কেন ইনস্টাগ্রামই জেন-জির পছন্দের প্ল্যাটফর্ম?
ইনস্টাগ্রামকে জেন-জি এত দ্রুত রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করল কেন? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে প্ল্যাটফর্মটির প্রকৃতিতেই। ছোট ছোট রিলস, মিম, ব্যঙ্গ, স্যাটায়ার এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট আজকের তরুণদের যোগাযোগের প্রধান ভাষা। দীর্ঘ বক্তৃতার বদলে ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও, তথ্যচিত্রের বদলে একটি তীক্ষ্ণ গ্রাফিক্স—এই নতুন যোগাযোগ পদ্ধতি মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
লাইভ প্রতিবাদ ও নাগরিক সাংবাদিকতার উত্থান
আরও একটি বড় পরিবর্তন হল রিয়েল-টাইম ডকুমেন্টেশন। আন্দোলনকারীরা এখন আর মূলধারার সংবাদমাধ্যমের উপর নির্ভরশীল নন। কোথাও পুলিশি অভিযান, গ্রেফতার, বিক্ষোভ কিংবা মিছিল—সবকিছুর ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে তথ্যপ্রবাহের উপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ভেঙে যাচ্ছে।

এক আন্দোলনের পর আরেক আন্দোলন
CJP-র সাফল্যের পর দেখা যাচ্ছে, একই কৌশল অনুসরণ করে একের পর এক ইস্যুভিত্তিক ডিজিটাল আন্দোলন গড়ে উঠছে। সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ Reservation Hatao Andolan (RHA) । এই প্ল্যাটফর্মটি সংরক্ষণনীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে এবং নিজেদের One Nation, One Identity: Indian স্লোগান সামনে রেখে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছে যায়।
একইভাবে E20 Janta Party নামের আরেকটি ডিজিটাল আন্দোলন ইথানল-যুক্ত E20 জ্বালানির বাধ্যতামূলক ব্যবহারের বিরোধিতা করে সামাজিক মাধ্যমে সমর্থন সংগ্রহ করছে। তাদের দাবি, সাধারণ গ্রাহকদের জন্য বিশুদ্ধ পেট্রোলের বিকল্প রাখা উচিত এবং পুরোনো গাড়ির মালিকদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই আন্দোলনও মূলত রিলস, মিম এবং অনলাইন আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।
ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির নতুন অধ্যায়
এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করছে যে, ভারতের তরুণদের মধ্যে “ইস্যুভিত্তিক ডিজিটাল রাজনীতি” দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রচলিত রাজনৈতিক দলের প্রতি অনাস্থা কিংবা দীর্ঘ সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তে নির্দিষ্ট সমস্যাকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের মধ্যে বিশাল জনসমর্থন তৈরি করার ক্ষমতা এই নতুন প্ল্যাটফর্মগুলির রয়েছে।
সুযোগের পাশাপাশি উদ্বেগও
তবে এই প্রবণতার উজ্জ্বল দিক যেমন আছে, তেমনই রয়েছে গুরুতর উদ্বেগও। সাম্প্রতিক প্রতিবাদ চলাকালীন শত শত ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর পোস্ট, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগও উঠেছে। মহারাষ্ট্র সাইবার সেলের তদন্তে বহু ভুয়া পোস্ট ও অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে।
এটাই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম যেমন দ্রুত সত্য ছড়িয়ে দিতে পারে, তেমনই গুজব, অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যও সমান গতিতে ভাইরাল হতে পারে। ফলে ডিজিটাল প্রতিবাদের শক্তির পাশাপাশি ডিজিটাল দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাজনীতির কৌশলও বদলাচ্ছে
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন রাজনৈতিক দলগুলির আচরণে। তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছতে এখন তারাও ইনস্টাগ্রামে বেশি সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। সংক্ষিপ্ত ভিডিও, রিলস এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের ধরণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, সামাজিক মাধ্যমের ভাষা এখন আর শুধু নাগরিকদের নয়; রাজনৈতিক নেতৃত্বও সেই ভাষা শেখার প্রয়োজন অনুভব করছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সামাজিক মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ অনুসারী থাকা মানেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠা নয়। ইতিহাস বলছে, ডিজিটাল জনপ্রিয়তাকে বাস্তব সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তর করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। CJP-র ক্ষেত্রেও এখন সেই পরীক্ষার সময় এসেছে—আন্দোলনের আবেগকে কি তারা দীর্ঘস্থায়ী গণআন্দোলন বা নীতিগত পরিবর্তনের পথে নিয়ে যেতে পারবে?
বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদে সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান
গত দুই দশকে সামাজিক আন্দোলন ও প্রতিবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, এক্স (আগের টুইটার), ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষ খুব দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করতে, প্রতিবাদ সংগঠিত করতে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের বক্তব্য পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বাইরে সাধারণ মানুষের তোলা ছবি, ভিডিও ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই আন্দোলনের প্রধান তথ্যসূত্র হয়ে উঠেছে।
টুইটার রেভলিউশন থেকে আরব বসন্ত
২০০৯ সালে ইরানের গ্রিন মুভমেন্ট-এ টুইটার ও ফেসবুকের ব্যাপক ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবে ‘টুইটার রেভলিউশন’ নামে পরিচিতি পায়। এরপর ২০১০ থেকে ২০১২ সালের আরব বসন্ত-এ তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া ও সিরিয়ায় ফেসবুক, টুইটার ও ইউটিউব আন্দোলন সংগঠিত করা এবং বিশ্ববাসীর সামনে ঘটনাগুলি তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের Occupy Wall Street আন্দোলন এবং ২০১২ সালের Anti-SOPA/PIPA প্রতিবাদে টুইটার, ফেসবুক, রেডিট ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম লক্ষ লক্ষ মানুষকে একত্রিত করতে সাহায্য করে। একইভাবে ২০১৩-১৪ সালে ইউক্রেনের Euromaidan আন্দোলন এবং ২০১৪ সালে হংকংয়ের Umbrella Movement-এ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আন্দোলনের প্রধান সংগঠক হিসেবে কাজ করে।

হ্যাশট্যাগ আন্দোলনের যুগ
২০১৭ সালে শুরু হওয়া #MeToo আন্দোলন বিশ্বজুড়ে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে লাখো মানুষকে নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ দেয়। একই বছরে Women’s March-ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গণআন্দোলনের রূপ নেয়। ২০১৮ সালের March for Our Lives আন্দোলনেও ইনস্টাগ্রাম, টুইটার ও স্ন্যাপচ্যাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২০১৯ সালের হংকংয়ের প্রত্যর্পণ বিল বিরোধী আন্দোলনে টেলিগ্রাম, LIHKG এবং ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীরা নিরাপদে যোগাযোগ রক্ষা ও কর্মসূচি পরিচালনা করেন। একই সময়ে চিলির সরকারবিরোধী আন্দোলনেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার থেকে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর শুরু হওয়া Black Lives Matter আন্দোলন ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, টিকটক ও ফেসবুকের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে ভারতের কৃষক আন্দোলনে টুইটার (বর্তমান এক্স), ইউটিউব, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ আন্দোলনের খবর দেশ-বিদেশে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২০২১ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানবিরোধী আন্দোলন, ২০২২ সালে ইরানের Woman, Life, Freedom আন্দোলন, ২০২৩ সালে ইসরায়েলের বিচারব্যবস্থা সংস্কার বিরোধী আন্দোলন, ২০২৪ সালে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের ছাত্র আন্দোলন এবং ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনেও সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিবাদ সংগঠিত করা, তথ্য প্রচার, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং নাগরিক সাংবাদিকতার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
আগামী দিনের গণতন্ত্রের নতুন জনপরিসর
বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু প্রতিবাদ সংগঠনের মাধ্যমই নয়, বরং জনমত গঠন, আন্তর্জাতিক সংহতি তৈরি, অর্থ সংগ্রহ, আইনি সহায়তা সমন্বয় এবং তাৎক্ষণিক তথ্য প্রচারের অন্যতম শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো, ঘৃণাত্মক প্রচার, অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত এবং সরকারি নজরদারির মতো চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে।
ভারতের গণতন্ত্র এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই অধ্যায়ে পোস্টার নয়, রিলস; লাউডস্পিকার নয়, স্মার্টফোন; এবং দলীয় কার্যালয়ের পাশাপাশি ইনস্টাগ্রামের ফিডও রাজনৈতিক জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। কিন্তু গণতন্ত্রের শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তথ্যের সত্যতা, মতের বহুত্ব এবং যুক্তিনির্ভর আলোচনার উপর। ইনস্টাগ্রাম সেই সুযোগ তৈরি করেছে—এখন চ্যালেঞ্জ হলো, এই নতুন ডিজিটাল জনপরিসরকে দায়িত্বশীল, তথ্যনির্ভর এবং গণতান্ত্রিক রাখার।